সবুজ পাতার ফাকে থোকায় থোকায় ঝুলছে লাল, সবুজ আর কালচে রঙের আঙুর। দূর থেকে দেখলে মনে হবে এটি ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশের আঙুর বাগান। কিন্তু না, এটি কোনো বিদেশি মাঠের দৃশ্য নয়; চোখজুড়ানো এই দৃশ্যের দেখা মিলছে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার গুনবহা গ্রামে।
প্রত্যন্ত এই গ্রামের মাঠে বিদেশি ফলের সমারোহ ঘটিয়ে রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন ৩২ বছর বয়সী মো. বাবর শেখ নামের এক অদম্য তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা। তাঁর হাত ধরেই এই অঞ্চলের মাটিতে বোনা হয়েছে ফল চাষের এক নতুন এবং সম্ভাবনাময় স্বপ্ন। বাবর শেখ গুনবহা গ্রামের আয়ুব শেখের ছেলে।
পেশায় সাধারণ কৃষক বাবর শেখের এই আঙুর বিপ্লবের গল্পটি শুরু হয়েছিল খুব বেশি দিন আগে নয়। ২০২২ সালের শেষের দিকে, প্রযুক্তির এই যুগে ইউটিউবে আঙুর চাষের বিভিন্ন ভিডিও দেখে উদ্বুদ্ধ হন তিনি। বাংলাদেশে আঙুর চাষ সফল হবে কি না; এমন হাজারো শঙ্কা ও সংশয়কে এক পাশে সরিয়ে রেখে তিনি সিদ্ধান্ত নেন নতুন কিছু করার। নিজের বাড়ির পাশে ২০ শতাংশ জমিতে শুরু করেন পরীক্ষা-নিরীক্ষা। শুরুতে যশোর, নাটোর এবং রাজশাহী থেকে ব্লাকরুবি, অস্ট্রেলিয়ান কিং, অ্যাকোলো এবং বাইকুনুর জাতের মোট ৫৬টি চারা সংগ্রহ করে রোপণ করেন।
সাধারণত বিদেশি ফল আমাদের দেশের জলবায়ুতে কেমন হবে, তা নিয়ে সংশয় থাকে। তবে বাবর শেখের কঠোর পরিশ্রম ও নিবিড় পরিচর্যায় চারা রোপণের মাত্র ছয় মাসের মাথায় গাছে ফল ধরতে শুরু করে। বর্তমানে তাঁর বাগানে গাছের সংখ্যা দুই শতাধিক। বিশেষ করে রুশ বংশোদ্ভূত ‘বাইকুনুর’ জাতের আঙুরটি বাবর শেখের বাগানে সবচেয়ে বেশি সাড়া ফেলেছে। এ জাতের আঙুরটির আকর্ষণীয় রঙ, আকার ও চমৎকার মিষ্টতা স্থানীয়দের চমকে দিয়েছে। এ বছর প্রতিটি গাছে মাটির পুষ্টি আর বাবর শেখের মমতায় থোকায় থোকায় প্রচুর পরিমাণ আঙুর ধরেছে।
বর্তমানে গুনবহা গ্রামের এই আঙুর বাগানটি স্থানীয়দের মুখে মুখে এক দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে কৌতূহলী মানুষ ছুটে আসছেন এই বাগানের রূপ দেখতে। দর্শনার্থীরা কেবল চোখ জুড়িয়েই ক্ষান্ত হচ্ছেন না, বাগান থেকে সরাসরি টাটকা ও মিষ্টি আঙুর পেড়ে খাওয়ার দুর্লভ অভিজ্ঞতাও নিচ্ছেন। কেউ কেউ ছবি তুলছেন, ভিডিও করছেন। কেউবা ভিডিও কলের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের আঙুর বাগানটি দেখাচ্ছেন। অনেকে পরিবারের জন্য কিনে নিয়ে যাচ্ছেন টাটকা আঙুর, যার প্রতি কেজির মূল্য নেয়া হচ্ছে ৫০০ টাকা। পাশাপাশি নিজেরাও এমন বাগান করার স্বপ্ন নিয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দরে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন আঙুরের চারা।
বাণিজ্যিক সফলতার পাশাপাশি বাবর শেখ এখন নতুন প্রজন্মের কৃষকদের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা। প্রথাগত ফসলের বাইরে এসে উচ্চ মূল্যের ফলের চাষ যে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে, তা প্রমাণ করেছেন তিনি। বাবর শেখের লক্ষ্য এখন আরও বড়। তিনি জানান, ভবিষ্যতে আরো বড় পরিসরে জমি নিয়ে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ও আধুনিক পদ্ধতিতে এই আঙুরের চাষ সম্প্রসারণ করতে চান। আমদানি নির্ভর এই ফলের স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে পারলে তা দেশের ফল চাহিদার ঘাটতি মেটানোর পাশাপাশি অর্থনীতিতেও বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
সফর আঙুর চাষি মো. বাবর শেখ বলেন, ‘‘ইউটিউব দেখে আঙুর চাষের স্বপ্ন বুনেছিলাম। আজ সেই স্বপ্ন আমার চোখের সামনে ডালপালা মেলে ফল দিতে শুরু করেছে। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ যখন এই বাগান দেখতে আসেন, তখন আমার সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।”

