ঢাকা মঙ্গলবার, ০৯ জুন, ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মণে ১৪ কেজি বেশি,

শত কোটি টাকার আম হারাচ্ছেন চাষিরা

বিশেষ প্রতিনিধি | জুন ৯, ২০২৬, ০২:৪৪ পিএম শত কোটি টাকার আম হারাচ্ছেন চাষিরা

৫৪ কেজিতে মণ, বাড়তি আমের দাম মেলে না
প্রতি মৌসুমে ৫০০ কোটির বেশি টাকার আম যাচ্ছে বিনা মূল্যে
প্রশাসনের ঢলন বাতিলের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি এখনো

রাজশাহী অঞ্চলের আম দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও ক্রমেই জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। প্রতিবছর আমকে ঘিরে এই অঞ্চলের অর্থনীতি সম্প্রসারিত হলেও দীর্ঘদিনের একটি প্রথা, ‘ঢলন’, আমচাষিদের ন্যায্য লাভ থেকে বঞ্চিত করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আম কেনাবেচা কেজিভিত্তিক হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন মোকাম ও পাইকারি বাজারে এখনো কৃষকদের ৪০ কেজির (এক মণ) পরিবর্তে ৫২ থেকে ৫৪ কেজি পর্যন্ত আম দিতে হচ্ছে। অথচ মূল্য পরিশোধ করা হচ্ছে মাত্র ৪০ কেজির হিসাবেই। ফলে উৎপাদিত আমের একটি বড় অংশ কার্যত বিনামূল্যে চলে যাচ্ছে ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের হাতে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর জেলায় প্রায় ১২ লাখ ৫৫ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও ভালো হয়েছে। তবে উৎপাদন বাড়লেও বাজার ব্যবস্থার নানা অসঙ্গতির কারণে চাষিরা কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছেন না।

আমচাষিদের অভিযোগ, বাগান পরিচর্যা, শ্রমিক, সার ও কীটনাশকের খরচ প্রতিবছর বাড়লেও বিক্রির সময় অতিরিক্ত ওজন দিতে বাধ্য হওয়ায় তাদের লাভের সুযোগ কমে যাচ্ছে। অনেক ব্যবসায়ী অতিরিক্ত ওজন ছাড়া আম কিনতে আগ্রহী নন বলেও অভিযোগ করেন তারা।

স্থানীয়ভাবে ‘ঢলন’ বলতে নির্ধারিত ওজনের চেয়ে অতিরিক্ত আম দেওয়াকে বোঝায়। একসময় পরিবহন, ঝরে যাওয়া বা পচনজনিত ক্ষতি সমন্বয়ের জন্য প্রতি মণে এক-দুই কেজি অতিরিক্ত আম দেওয়ার প্রচলন ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রথা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে এখন অনেক বাজারে ৪০ কেজির দামে ৫২ থেকে ৫৪ কেজি পর্যন্ত আম নেওয়া হচ্ছে।

অর্থনৈতিক হিসাবে ক্ষতির পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। উদাহরণস্বরূপ, এক মণ আমের দাম ২ হাজার টাকা হলে কাগজে-কলমে প্রতি কেজির মূল্য দাঁড়ায় ৫০ টাকা। কিন্তু কৃষক যদি একই দামে ৫৪ কেজি আম দেন, তাহলে প্রকৃত মূল্য নেমে আসে প্রায় ৩৭ টাকায়। অর্থাৎ উৎপাদিত পণ্যের প্রায় ২৬ শতাংশ মূল্য থেকে তিনি বঞ্চিত হন।

অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের দাবি, পরিবহন, বাছাই, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের সময় কিছু ক্ষতি হয় এবং ওজন কমে যায়। দীর্ঘদিন ধরে সেই ক্ষতি সমন্বয়ের জন্যই অতিরিক্ত ওজন নেওয়ার প্রচলন গড়ে উঠেছে।

এই বিরোধ নিরসনে গত বছরের জুনে প্রশাসনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ঢলন প্রথা বাতিল করে কেজিভিত্তিক আম বেচাকেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি আড়তদারদের কমিশনও নির্ধারণ করা হয়। তবে কৃষকদের অভিযোগ, সিদ্ধান্তটি এখনো কার্যকর হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষকরা ন্যায্যমূল্য না পেলে কৃষি খাতের টেকসই উন্নয়ন ব্যাহত হবে। তারা প্রতিটি বাজারে ইলেকট্রনিক ওজনযন্ত্র ব্যবহার, ডিজিটাল রসিদ চালু, নিয়মিত বাজার তদারকি এবং কৃষক সংগঠনকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। প্রশাসনও কেজিভিত্তিক আম বেচাকেনা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার আশ্বাস দিয়েছে।

কালের সমাজ/এএইচবি 

Link copied!