ক্যারিবিয়ান সাগরের দ্বীপরাষ্ট্র কিউবায় শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। দেশটির উত্তর-পশ্চিম উপকূলের কাছে আঘাত হানা এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৬ দশমিক ১। এটি গত প্রায় ১৫০ বছরের মধ্যে ওই অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভূমিকম্পের জেরে কিউবা ছাড়াও ক্যারিবীয় অঞ্চল, মেক্সিকো উপসাগর এবং যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় কম্পন অনুভূত হয়েছে। ভূমিকম্পের পর আতঙ্কে মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবে কোনও প্রাণহানি বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে বলছে, স্থানীয় সময় সোমবার (৮ জুন) কিউবার উত্তর-পশ্চিম উপকূলের কাছে ওই শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর কম্পন ক্যারিবীয় অঞ্চলের বিভিন্ন অংশ, মেক্সিকো উপসাগর এবং যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত অনুভূত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, গত প্রায় ১৫০ বছরের মধ্যে এটি ওই অঞ্চলে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প।
ব্যাপক কম্পন এবং সতর্কতামূলকভাবে বিভিন্ন স্থাপনা খালি করা হলেও কর্তৃপক্ষ কোনও প্রাণহানি বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ১। এর উৎপত্তিস্থল ছিল ভূ-পৃষ্ঠের প্রায় ২৬ কিলোমিটার গভীরে।
ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল পশ্চিম কিউবার মানতুয়া শহরের পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিমে প্রায় ১০৪ কিলোমিটার দূরে। ভূকম্পবিদরা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পটি অস্বাভাবিক ছিল। কারণ ভূমিকম্পটি দুটি বড় টেকটোনিক প্লেটের সীমান্তে নয়, বরং একটি টেকটোনিক প্লেটের অভ্যন্তরে সংঘটিত হয়েছে। সাধারণত বড় ভূমিকম্প প্লেটের সীমান্তবর্তী এলাকাতেই বেশি দেখা যায়।
ইউএসজিএসের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ১৮৮০ সালে সান ক্রিস্তোবালের কাছে আনুমানিক ৬ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের পর থেকে এই অঞ্চলের ৩২০ কিলোমিটারের মধ্যে একই ধরনের শক্তিশালী কোনও ভূমিকম্পের রেকর্ড পাওয়া যায়নি।
ভূমিকম্পের পর পশ্চিম কিউবার বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে হাভানা ও পিনার দেল রিও শহরে শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়। বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ভবন দুলতে শুরু করলে আতঙ্কে মানুষ দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসেন। অনেকেই বলেছেন, এর আগে তারা এত তীব্র কম্পন কখনও অনুভব করেননি।
এদিকে ভূমিকম্পের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের মায়ামি, ফোর্ট লডারডেল এবং অরল্যান্ডোর উত্তরের কিছু এলাকাতেও ভবন ও আসবাবপত্র কাঁপতে দেখা যায়। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে মায়ামি-ডেড কাউন্টির কয়েকটি সরকারি অফিস খালি করা হয়। পাশাপাশি পরিদর্শনের জন্য দুটি উঁচু রেলপথে চলাচলকারী কমিউটার ট্রেনের সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
ফ্লোরিডার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, প্রায় এক মিনিট ধরে অস্বাভাবিক কম্পন অনুভূত হয়েছে, যা এই অঙ্গরাজ্যে বিরল ঘটনা। পরে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে, সেখানে কারও আহত হওয়ার ঘটনা বা উল্লেখযোগ্য সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপেও কম্পন অনুভূত হয়েছে। জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র কানকুন, প্লায়া দেল কারমেন এবং তুলুমেও কম্পন টের পান বাসিন্দারা। কম্পন অনুভূত হওয়ার পর কর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা বিভিন্ন ভবন থেকে বেরিয়ে আসেন। ইউকাতান ও কুইনতানা রু অঙ্গরাজ্যের গভর্নররা জানিয়েছেন, তাৎক্ষণিকভাবে কোনও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
বিজ্ঞানীরা বলেছেন, সর্বশেষ এই ভূমিকম্প ছিল মেক্সিকো উপসাগরে যন্ত্রের মাধ্যমে রেকর্ড করা সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকম্পগুলোর একটি।
ইউএসজিএসের এক ভূ-পদার্থবিদ জানিয়েছেন, বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আধুনিক ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ শুরু হওয়ার পর থেকে এ অঞ্চলে ৫ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্পের ঘটনা হাতে গোনা কয়েকবারই ঘটেছে।
অবশ্য ভূমিকম্পের পর কোনও সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়নি। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, পশ্চিম কিউবায় কিছু পরাঘাত অনুভূত হতে পারে। তবে সেগুলো তুলনামূলকভাবে দুর্বল হবে এবং ফ্লোরিডা বা আরও দূরবর্তী অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কিউবার মধ্যকার সম্পর্ক দীর্ঘ কয়েক দশক ধরেই অত্যন্ত উত্তেজনাকর এবং বৈরী। ২০২৬ সালের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সম্পর্কটি একটি সংকটাপন্ন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
কালের সমাজ/এসআর

