বাংলাদেশের বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক আইনি লড়াই নতুন মোড়ে পৌঁছেছে। সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়ে হাই কোর্ট যে রায় দিয়েছিল, তা আপাতত স্থগিত করেছে আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের করা আপিলের শুনানির দিন নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ১৬ জুন।
মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী-এর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ এ সিদ্ধান্ত দেয়। ফলে আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত হাই কোর্টের রায় কার্যকর হবে না।
হাই কোর্টের রায় কী ছিল?
২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ তিন মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেয়। পরে চলতি বছরের ৭ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ১৮৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়।
রায়ের আগেই অন্তর্বর্তী সরকার বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেয়। ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর পৃথক সচিবালয় গঠনের প্রস্তাব অনুমোদনের পর ৩০ নভেম্বর জারি করা হয় ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’।
কী দায়িত্ব পেয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়?
অধ্যাদেশ কার্যকর হওয়ার পর নিম্ন আদালতের বিচারকদের—
- বদলি,
- পদোন্নতি,
- শৃঙ্খলাজনিত ব্যবস্থা,
- ছুটি,
- এবং নিয়োগসংক্রান্ত কার্যক্রম
সরাসরি সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের অধীনে চলে আসে।
১১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে সচিবালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। সে সময়ের প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক ভবন-৪-এ এর উদ্বোধন করেন।
বিএনপি সরকারের সিদ্ধান্ত
পরবর্তীতে নির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে বিচারক নিয়োগ ও সচিবালয়সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো বাতিলের উদ্যোগ নেয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ পাস হয়।
বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদে এ পদক্ষেপকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করলেও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আইন প্রণয়নের চূড়ান্ত ক্ষমতা সংসদের হাতেই ন্যস্ত।
আইনটি কার্যকর হওয়ার ফলে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় তার আইনগত ভিত্তি হারায়। বিচারক নিয়োগসহ প্রশাসনিক কার্যক্রম আবার আগের কাঠামোয়, অর্থাৎ আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফিরে যায়। পরে ১৯ মে বিলুপ্ত সচিবালয়ে কর্মরত ১৫ জন বিচারক ও জুডিসিয়াল সার্ভিস কর্মকর্তাকে আইন ও বিচার বিভাগে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
আপিলের পটভূমি
স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা-সংবলিত হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে। পরে চেম্বার বিচারপতি ফারাহ মাহবুব বিষয়টি শুনানির জন্য আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে পাঠিয়ে দেন।
এখন সেই আপিলের শুনানি হবে ১৬ জুন, যা বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতার প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের দাবি
বাংলাদেশে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত করার দাবি নতুন নয়। এ দাবির সূত্রপাত হয় ১৯৯৫ সালে, যখন মাসদার হোসেন এবং তাঁর সহকর্মীরা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে মামলা করেন।
পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ঐতিহাসিক রায়ে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক ও স্বাধীন করার নির্দেশনা দেয়। মাসদার হোসেন মামলা বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
এখন ১৬ জুনের আপিল শুনানি শুধু একটি সচিবালয়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; বরং বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কেও নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারে।
কালের সমাজ/এএইচবি

