বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কথিত ‘পুশইন’ বা জোরপূর্বক মানুষ ঠেলে পাঠানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, পরিচয় যাচাই ও বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। অন্যদিকে ভারত এ বিষয়ে সরাসরি কোনো স্বীকারোক্তি না দিয়ে দাবি করছে, তারা কেবল অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কাজ করছে।
গত মে মাস থেকে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুদের বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। তবে বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে এসব প্রচেষ্টা অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়েছে। কয়েকটি সীমান্ত এলাকায় এখনও কিছু মানুষ শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। এ পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন শুরু হয়েছে, যেখানে পুশইন ইস্যু গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হওয়ার কথা রয়েছে।
সীমান্তে আটকে পড়া নারী, শিশু ও বয়স্কদের কারণে বিষয়টি মানবিক সংকটের রূপ নিয়েছে। পরিচয় যাচাই ছাড়া কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দিলে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা ও কূটনৈতিক সম্পর্কেও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মত বিশ্লেষকদের।
বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ থেকে ৬ জুন পর্যন্ত মাত্র চার দিনে ঝিনাইদহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর, নওগাঁর সাপাহার, লালমনিরহাটের বারখাতা ও পাটগ্রাম এবং পঞ্চগড় সীমান্তে অন্তত ২৩টি পুশইনের চেষ্টা হয়েছে। এসব ঘটনায় দুই শতাধিক মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও বিজিবির তৎপরতায় তা প্রতিহত করা হয়। এছাড়া গত ৪ জুন মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০টি পুশইন প্রচেষ্টা ঠেকানোর তথ্যও জানিয়েছে বাহিনীটি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সীমান্তজুড়ে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং বিজিবিকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ১২ থেকে ১৩টি কূটনৈতিক চিঠি ভারতের কাছে পাঠিয়েছে। তিনি বলেন, অবৈধ নাগরিক প্রত্যাবাসনের জন্য দুই দেশের মধ্যে একটি স্বীকৃত প্রক্রিয়া রয়েছে এবং সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সমস্যার সমাধান করতে হবে। কোনো ধরনের পুশইন বাংলাদেশ গ্রহণ করবে না বলেও তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, ভারত যদি বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা না করে, তবে তা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সম্প্রতি দাবি করেছেন, ভারত আইন ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের ফেরত পাঠাচ্ছে। তিনি বাংলাদেশের কাছে অবৈধ বাংলাদেশিদের তালিকা দেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন এবং পরিচয় শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া দ্রুত করার আহ্বান জানান।
কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পুশইন ইস্যুর সমাধান একমাত্র কূটনৈতিক পথেই সম্ভব। বৈধ প্রত্যাবাসন ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও সীমান্ত দিয়ে মানুষ ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা আন্তর্জাতিক রীতি ও প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের পরিপন্থী। তারা মনে করেন, বাংলাদেশকে সীমান্তে কঠোর অবস্থান বজায় রাখার পাশাপাশি কূটনৈতিকভাবে বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপন করতে হবে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর সহায়তা নেওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন তারা। তবে শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমেই এই সংকটের সমাধান হওয়া উচিত বলে মত সংশ্লিষ্টদের।
কালের সমাজ/এএইচবি

