এমপিওভুক্ত দাখিল মাদ্রাসা ভবন। সেখানেই চলছে আলাদা নামে নূরানী ও হাফেজিয়া মাদ্রাসা কার্যক্রম। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে মাসিক বেতন, আবার ডে-কেয়ারের নামেও আদায় করা হচ্ছে টাকা। নূরানী শাখাটি কখনও আলাদা প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান আবার মাদ্রাসা সুপারের ভাষ্যে দাখিল মাদ্রাসার শাখা। এ নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার আদ্রা উত্তর ইউনিয়ন মেরকট বাজার দারুসসুন্নাহ দাখিল মাদ্রাসায় এমন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। মাদ্রাসা ভবনের পূর্ব পাশের চারটি কক্ষে মেরকট বাজার কিন্ডারগার্টেন নূরানী ও হাফেজিয়া মাদ্রাসা নামে দীর্ঘদিন ধরে নূরানী কার্যক্রম চলছে। অভিযোগ রয়েছে, এ কার্যক্রম মাদ্রাসার সুপার মাওলানা আব্দুল গফুরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথম থেকে তৃতীয় জামাত পর্যন্ত এ শাখায় প্রায় ৭৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের কাছ থেকে প্রথম জামাতে মাসে ২০০ টাকা, দ্বিতীয় জামাতে ৩০০ টাকা এবং তৃতীয় জামাতে ৩৫০ টাকা করে বেতন নেওয়া হচ্ছে। এর বাইরে ডে-কেয়ারের জন্য শিক্ষার্থীপ্রতি আরও ২০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে মেরকট বাজার দারুসসুন্নাহ দাখিল মাদ্রাসা ভবনে গিয়ে দেখা যায়, অফিস কক্ষে সুপার মাওলানা আব্দুল গফুর উপস্থিত। ভবনের পূর্ব পাশের চারটি শ্রেণিকক্ষে নূরানী বিভাগের পাঠদান চলছে। সেখানে প্রায় ৬০ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল। মাওলানা মোশাররফ হোসেন-সহ কয়েকজন শিক্ষক পাঠদান করছিলেন।
তৃতীয় জামাতের একটি শ্রেণিকক্ষে গিয়ে দেখা যায়, চারটি পাঠ্যবইয়ের মধ্যে তিনটি বেসরকারি প্রকাশনার বই ব্যবহার করে পাঠদান করা হচ্ছে।
প্রথম জামাতের শিক্ষার্থী সাব্বির হোসেনের মা নাছিমা আক্তার বলেন, আমার ছেলে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। প্রতি মাসে ২০০ টাকা করে বেতন দিচ্ছি। ডে-কেয়ার বাবদ আরও ২০০ টাকা দিয়ে আসছি।
তৃতীয় জামাতের শিক্ষার্থী আরাফাত হোসেন থেকে জানতে চাইলে বলেন, আমরা প্রথম জামাত থেকেই মাসিক বেতন দিয়ে পড়ালেখা করছি। আমাদের মাদ্রাসার নাম মেরকট বাজার কিন্ডারগার্টেন নূরানী ও হাফেজিয়া মাদ্রাসা। হুজুররা নূরানী সিলেবাস অনুযায়ী পড়ান।
নূরানী শাখা শিক্ষক মাওলানা মোশাররফ হোসেন বলেন, আমাদের নূরানী শাখায় ৭৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। সরকারি পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি নূরানীর কিছু বই থেকেও পাঠদান করা হয়। দাখিল মাদ্রাসার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। এটি আলাদা একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান। দাখিল মাদ্রাসা সুপার মাওলানা আব্দুল গফুর সাহেব আমাদের প্রতিষ্ঠানের প্রধান।
তবে দাখিল মাদ্রাসা শিক্ষক মাওলানা ফয়জুল্লাহ বলেন, এটি মেরকট বাজার দারুসসুন্নাহ দাখিল মাদ্রাসার একটি শাখা। আমরা নূরানী শাখা হিসেবে এটি ব্যবহার করছি। প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের মতো করে পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনজনের দায়িত্বে শাখাটি পরিচালিত হচ্ছে।
নূরানী শাখা শিক্ষক মাওলানা রিয়াদ হোসেন বলেন, প্রধান শিক্ষকের আদেশক্রমে প্রথম জামাতে ২০০ টাকা, দ্বিতীয় জামাতে ৩০০ টাকা ও তৃতীয় জামাতে ৩৫০ টাকা করে মাসিক বেতন আদায় করি।
মাদ্রাসা দাতা সদস্য আবুল কালাম বলেন, মাদ্রাসাটি এমপিওভুক্ত হওয়ার পরও এখানে নূরানী কার্যক্রম চলছে। এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান ভবনে কীভাবে একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার। নূরানী কার্যক্রমটি কোন প্রতিষ্ঠানের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থের হিসাব কী এবং ভবন ব্যবহারের অনুমোদন রয়েছে কি না—এসব বিষয় তদন্ত করা প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে মাদ্রাসা সুপার মাওলানা আব্দুল গফুরের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি ব্যস্ত আছি। মাগরিবের পর কল দিবো। মাগরিবের পর একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
নাঙ্গলকোট উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইউনুছ বলেন, আমি নূরানী শাখা সম্পর্কে অবগত নই। এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ভবনে নূরানী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করার কোনো নিয়ম নেই। বিষয়টি সম্পর্কে মাদ্রাসার সুপারের সঙ্গে যোগাযোগ করে সত্যতা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নাঙ্গলকোট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও মাদ্রাসাটির এডহক কমিটির সভাপতি মো.আবু রায়হান বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই। খোঁজ নিয়ে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কালের মসাজ/কে.পি

