বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কার নিয়ে নতুন করে সতর্কবার্তা দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটি বলেছে, প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম যথাসময়ে ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হলে চলতি বছর শেষে দেশের প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, উন্নয়ন ব্যয় বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়ানো এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূর করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে আইএমএফ।
অন্যদিকে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নতুন ঋণ কর্মসূচির আওতায় আইএমএফের কাছে ৬ থেকে সাড়ে ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থায়নের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। সরকারের লক্ষ্য আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন কর্মসূচি চূড়ান্ত করা। এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অনুমোদিত ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের আগের ঋণ কর্মসূচির পরিবর্তে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি কাঠামো তৈরি করতে চায় সরকার।
গত ১২ থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত পাঁচ দিনের সফরে আইএমএফের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে অবস্থান করে। এ সময় তারা অর্থ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অবস্থা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রাজস্ব আহরণ, বাজেট ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সুশাসন, খেলাপি ঋণ, ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা, সরকারি ব্যয় এবং নতুন পে-স্কেলসহ অর্থনীতির প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
সফর শেষে ঢাকা ত্যাগের আগে আইএমএফ এক পর্যবেক্ষণে জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও পণ্যবাজারে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে আমদানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি দেশে মূল্যস্ফীতির ওপরও নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে সীমিত রাজস্ব আহরণ, উচ্চ ভর্তুকি ব্যয় এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
আইএমএফের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, প্রবাসী আয় ইতিবাচক ধারায় থাকলেও বৈদেশিক খাত এখনো পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের উচ্চহার, দুর্বল সুশাসন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার নানা সীমাবদ্ধতা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতিতে ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তবে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন, ভর্তুকি ব্যবস্থার সংস্কার এবং আর্থিক খাতের প্রয়োজনীয় পরিবর্তন বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে মধ্যমেয়াদে প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশেরও নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচিত সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হচ্ছে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়া। তবে এসব সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেশের বাস্তবতা, জনগণের স্বার্থ এবং সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, নতুন ঋণ কর্মসূচির ভিত্তি আগেই চিহ্নিত নীতিগত বিষয়গুলোর ওপর দাঁড়াবে। একই সঙ্গে আগের কর্মসূচির কয়েকটি কঠোর শর্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার আইএমএফের কাছে নমনীয়তা চেয়েছে। তার ভাষ্য, অন্তর্বর্তী সরকার এমন কোনো দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নিতে চায়নি, যা ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকারের নীতিনির্ধারণের সুযোগকে সীমিত করে। তাই নতুন কর্মসূচি এমনভাবে সাজানোর চেষ্টা চলছে, যা বাস্তবায়নযোগ্য হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নতুন ঋণ কর্মসূচির আওতায় অর্থায়নের পরিমাণ, সংস্কারের রূপরেখা এবং বাস্তবায়নের সময়সূচি নিয়ে ইতোমধ্যে প্রাথমিক আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে। আগামী অক্টোবরে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভার ফাঁকে এ বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে নতুন কর্মসূচির কাঠামো, অর্থায়নের পরিমাণ, সংস্কারের সময়সূচি এবং ঋণের কিস্তি ছাড়ের রূপরেখা নিয়ে আরও অগ্রগতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এরপর নভেম্বরে আইএমএফের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আবার ঢাকা সফর করে চূড়ান্ত আলোচনা করবে এবং সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই নতুন ঋণ কর্মসূচির চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে রাজস্ব সংস্কার, ব্যাংকিং খাতের সুশাসন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই।
একই সঙ্গে বাস্তবসম্মত ও ধাপে ধাপে সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে নতুন আইএমএফ কর্মসূচি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কালের সমাজ/এএইচবি

