বলতে গেলে হামাগুড়ির বয়স থেকেই মায়ের আঙুল ধরে নাচের ছন্দে পা মেলাতেন তিনি। শৈশবের সেই আধো-আধো চরণের অবুঝ অঙ্গভঙ্গিই যে একদিন জীবনের মূল সুর হয়ে উঠবে, তা হয়তো তখন কেউ ভাবেনি। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সংস্কৃতির প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ধারা `কত্থক` নৃত্যের ধ্রুপদী মুদ্রায় নিজেকে সম্পূর্ণ জড়িয়ে নিয়েছেন তিনি। সাধারন, কত্থক ও লোক নৃত্যের প্রসারে নিবেদীত রয়েছেন। তিনি কামরুন্নেসা দোলন, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যিনি দোলন নামেই সুপরিচিত। শুধু নিজের সাধনাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, লেখাপড়ার পাশাপাশি সমানতালে নাচের তালিম নিয়ে আজ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন দক্ষ নৃত্য প্রশিক্ষক হিসেবে।
মায়ের হাত ধরে শুরু, গুরুদের আশীর্বাদে পথচলা
দোলনের এই সুদীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ পথচলার প্রধান শক্তি এবং অন্যতম সারথি হলেন তাঁর মা। মায়ের অকৃত্রিম উৎসাহ, নিবিড় পরিচর্যা আর অনুপ্রেরণাকে সঙ্গী করেই আজকের এই অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছেন তিনি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি ২০০৯ সালে নৃত্যের ওপর সফলভাবে সার্টিফিকেট কোর্স সম্পন্ন করেন দোলন। কত্থক নৃত্যকে আপন করে নেওয়ার এই যাত্রায় তিনি দেশের প্রথিতযশা নৃত্যগুরুদের সান্নিধ্য ও আশীর্বাদ লাভ করেছেন। নৃত্যগুরু ফারহানা চৌধুরী বেবী, সাজু আহমেদ, সোহেল রহমানের মতো গুণী শিল্পীদের হাত ধরে পরিমার্জিত হয়েছে তাঁর নৃত্যের মুদ্রা ও শৈল্পিক ব্যাকরণ।
নৃত্যের শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা
কামরুন্নেসা দোলনের জীবন কেবল নৃত্যের মঞ্চেই সীমাবদ্ধ নয়, তিনি একজন সফল কর্মজীবী নারীও বটে। বর্তমানে তিনি স্বনামধন্য ঝংকার ললিতকলা একাডেমিতে ২ বছর ধরে নৃত্য প্রশিক্ষক হিসেবে তরুণ প্রজন্মকে ধ্রুপদী নৃত্যের পাঠ দিচ্ছেন। একই সাথে পেশাগত জীবনে তিনি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় অব বাংলাদেশ সহকারী রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। শিল্পচর্চা ও প্রশাসনিক দায়িত্ব দুটি ভিন্নধর্মী ভুবনকে যেভাবে তিনি সমান দক্ষতায় সামাল দিচ্ছেন, তা সত্যিই অনন্য এবং অনুকরণীয়।

মায়ের সঙ্গে দোলন
নাট্যমঞ্চের অভিজ্ঞতা ও সংস্কৃতির বিকাশ
বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী দোলন কেবল নৃত্যের ঘুঙুরেই নিজেকে বেঁধে রাখেননি, কাজ করেছেন থিয়েটারেও। দেশের ঐতিহ্যবাহী নাট্যসংগঠন পদাতিক নাট্য সংসদে ১৮ বছর ধরে যুক্ত থেকে অভিনয় ও মঞ্চের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। এই নাট্য-অভিজ্ঞতা তাঁর নৃত্য পরিবেশনা এবং অঙ্গভঙ্গির প্রকাশভঙ্গিকে আরও বেশি প্রাণবন্ত ও ম্যাচিউরড করে তুলেছে বলে তিনি মনে করেন।
আগামীর স্বপ্ন সমৃদ্ধ নৃত্য একাডেমি
মায়ের ভালোবাসা আর গুরুদের আশীর্বাদকে পাথেয় করে আগামীতে দেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক উন্নয়নে নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করতে চান কামরুন্নেসা দোলন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি আন্তর্জাতিক মানের `নৃত্য একাডেমি` প্রতিষ্ঠা করা। যেখানে তরুণরা কত্থকসহ ধ্রুপদী নৃত্যের সঠিক ব্যাকরণ শিখতে পারবে। দোলন বিশ্বাস করেন, নাচের এই প্রাচীন ও সমৃদ্ধ শিল্পধারাকে টিকিয়ে রাখতে এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করতে একটি সঠিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কোনো বিকল্প নেই। সংস্কৃতির এই নিবেদিতপ্রাণ শিল্পী তাঁর নাচ, প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব এবং আগামীর স্বপ্ন নিয়ে এভাবেই প্রতিনিয়ত ডানা মেলে চলেছেন এক অন্তহীন সম্ভাবনার আকাশে।
কালের সমাজ/এএইচবি

