ঢাকা সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩

স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের বেড়াজালে বন্দি কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়...

জেলা প্রতিনিধি,কুড়িগ্রাম | আগস্ট ৩১, ২০২৬, ০৮:৪৯ পিএম স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের বেড়াজালে বন্দি কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়...

প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছর পার হলেও কাঙ্ক্ষিত প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক ভিত্তি পায়নি কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। কোনো স্থায়ী শিক্ষক, কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারী ছাড়াই জোড়াতালি দিয়ে চলছে উচ্চশিক্ষার এই প্রতিষ্ঠানের পাঠদান ও দাপ্তরিক কাজ। আর প্রাতিষ্ঠানিক এই দুর্বলতার সুযোগে উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ রাশেদুল ইসলামের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।


অভিযোগ রয়েছে, স্থায়ী নিয়োগ ঝুলিয়ে রেখে উপাচার্য নিজের পরিবার ও স্বজনদের চুক্তিভিত্তিক (অ্যাডহক) বসিয়েছেন নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে।


​বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে জাতীয় সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন পর্যন্ত কৃষি ও ফিশারিজ—এই দুটি অনুষদে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। তবে কোনো স্থায়ী শিক্ষক নেই। পুরো পাঠদানই পরিচালিত হচ্ছে চুক্তিভিত্তিক ও খণ্ডকালীন শিক্ষকদের ওপর ভর করে। ইউজিসি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের স্থায়ী নিয়োগের জন্য ৪০টি পদ অনুমোদন করলেও প্রশাসন গত দুই বছরে স্থায়ী কোনো নিয়োগ দেয়নি।


​উল্টো অভিযোগ উঠেছে, উপাচার্য তাঁর আপন স্বজনদের নিয়োগ দিতেই স্থায়ী প্রক্রিয়া পিছিয়ে দিয়েছেন। ইতোমধ্যে তাঁর পরিবারের অন্তত ১০ থেকে ১৫ জন সদস্য বিভিন্ন পদে সাময়িক নিয়োগ পেয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপাচার্যের আপন বোনের ছেলে আতিকুর রহমানকে পিএস টু ভিসি (সেকশন অফিসার), আপন শ্যালক আব্দুল্লাহ সোহাগকে সেকশন অফিসার (সিকিউরিটি ও পরিকল্পনা), আপন বোনের মেয়ে রেজবিন আক্তারকে কম্পিউটার টাইপিস্ট এবং বোনপুত মোস্তফা সরকারকে সেকশন অফিসার (পরীক্ষা বিভাগ) পদে বসানো হয়েছে।


পিএস আতিকুর রহমান ও সহকারী স্টোর কিপার পদে নিয়োগ পাওয়া রেজভীন বেগমের চাকরির বয়সসীমা আগেই পার হয়ে গিয়েছিল বলে জানা গেছে। ফিশারিজ অনুষদে মাস্টার্স সম্পন্ন হওয়ার আগেই মো. আহসানুল হক ও মরিয়ম আক্তার নামের দুজনকে প্রভাষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা সরাসরি ইউজিসির নীতিমালার লঙ্ঘন।

বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসনিক শৃঙ্খলা কতটা ভেঙে পড়েছে, তার প্রমাণ মেলে বিভিন্ন নথি পর্যালোচনায়। উপাচার্যের শ্যালক আব্দুল্লাহ সোহাগ এবং ভাগ্নে আতিকুর রহমানের হাতেই কার্যত পুরো প্রশাসনিক ও টেন্ডার কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ। এমনকি টেন্ডারের নথিপত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম বহির্ভূতভাবে শ্যালক আব্দুল্লাহ সোহাগের সই পাওয়া গেছে।


​নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শিক্ষক জানান, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ভালো শিক্ষক বা কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ার কোনো সদিচ্ছা উপাচার্যের নেই। অভিযোগ রয়েছে, স্থায়ী ও খণ্ডকালীন পদগুলোতে নিয়োগের বিনিময়ে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের লেনদেন বা ঘুষের রেটও নির্ধারিত রয়েছে।

আইন অনুযায়ী উপাচার্যের ক্যাম্পাসে সার্বক্ষণিক অবস্থান করার কথা থাকলেও অধ্যাপক রাশেদুল ইসলাম অধিকাংশ সময় ঢাকায় অবস্থান করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ঢাকার একটি গেস্ট হাউজকে কার্যালয় বানিয়ে সেখান থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা হয়। এতে একদিকে স্থায়ী শিক্ষকের অভাব, অন্যদিকে উপাচার্যের অনুপস্থিতিতে প্রশাসনিক ও একাডেমিক স্থবিরতা চরম আকার ধারণ করেছে। এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায়।

কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার আগেও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ ছিল। অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষা ছুটিতে গিয়ে প্রায় ১ বছর ১১ মাস ১৫ দিন অননুমোদিত অনুপস্থিত থাকার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। পরে বিষয়টি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না করেই তাঁর পদোন্নতি হয়। এছাড়া নিজের প্রভাব খাটিয়ে স্ত্রী হোসনে আরা হীরাকে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক পদে অনিয়ম করে নিয়োগ দেওয়ানোর অভিযোগও রয়েছে।

ভাগ্নে আতিকুর রহমান স্বজনপ্রীতির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "আমি স্যারের কোনো আত্মীয় নই। আমার বাড়ি স্যারের বাড়ি থেকে কিছু দূরে হওয়ায় অনেকে ভুল বোঝেন। প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে ভিসি স্যার কাছের মানুষদের দিয়ে কাজ করাচ্ছেন, যা পুরোনো কর্মীরা মেনে নিতে পারছেন না।"


​সার্বিক বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম বলেন, "আমার কোনো নিকটাত্মীয়কে নিয়ম বহির্ভূতভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বর্তমানে যারা কাজ করছেন তারা যোগ্যতার ভিত্তিতে সাময়িকভাবে নিয়োজিত এবং তারা শিক্ষা কার্যক্রম সুন্দরভাবে চালাচ্ছেন। খুব শিগগিরই পত্রিকার বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে স্থায়ী নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করা হবে।" ​ক্যাম্পাসে অনুপস্থিতির বিষয়ে তিনি বলেন, "নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় সরকারি ও ইউজিসির বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে আমাকে ঢাকায় থাকতে হয়। তবে আমি ছুটির দিনেও ক্যাম্পাসে রাত পর্যন্ত কাজ করি।"


এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক লিয়াকত আলী বলেন, ​"একটি সম্ভাবনাময় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে শুরুতেই স্বজনপ্রীতি, নিয়মবহির্ভূত নিয়োগ ও প্রশাসনিক অনিয়মের এমন গুরুতর অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত। শিক্ষার আলো ছড়ানোর পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানটি যদি অনিয়মের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়, তবে তা কুড়িগ্রামের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার ওপর বড় আঘাত। স্থায়ী শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগ না দিয়ে পছন্দসই মানুষদের চুক্তিভিত্তিক বসানো এবং আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরী। কুড়িগ্রামের উচ্চশিক্ষার পরিবেশ রক্ষা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ফেরাতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অবিলম্বে সরজমিনে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।"

কালের সমাজ/কে.পি


 

গ্রাম-গঞ্জ বিভাগের আরো খবর

Link copied!