বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিদেশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন নির্দেশনা দিয়েছে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়। নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্ধারিত নিয়ম মেনে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। মালয়েশিয়ার নতুন এই নির্দেশনাকে দেশটির শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাব্য প্রস্তুতি হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ।
এর আগে মালয়েশিয়ার অনুমোদিত কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের জন্য ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি এবং বাংলাদেশে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ৪০টির বেশি মেডিক্যাল সেন্টারের তালিকা প্রকাশ করে। তালিকা প্রকাশের পর দেশের জনশক্তি রপ্তানিকারকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও এ ব্যবস্থাকে ‘সিন্ডিকেট’ হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রশ্ন তুলেছে।
এ পরিস্থিতিতে বিষয়টি পরিষ্কার করতে মালয়েশিয়া সরকারের কাছে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়। প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, দুই দেশের সরকার শ্রমবাজার নিয়ে কাজ করছে এবং পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা হবে। কোনো ধরনের গোপনীয়তা বা সিন্ডিকেটের সুযোগ থাকবে না বলেও তিনি আশ্বস্ত করেছেন।
এর আগে জুলাইয়ের শেষ দিকে মালয়েশিয়া সফর শেষে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানিয়েছিলেন, আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে বাংলাদেশি কর্মীদের মালয়েশিয়ায় পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। পরে চলতি মাসের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানও একই ধরনের আশাবাদ জানিয়েছিলেন। তবে এখন পর্যন্ত শ্রমবাজার আনুষ্ঠানিকভাবে কবে খুলবে, সে বিষয়ে মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট ঘোষণা আসেনি।
কর্মী নিয়োগে ৮ ধাপ
মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, বিদেশি কর্মী নিয়োগ থেকে শুরু করে তাদের দেশটিতে প্রবেশ পর্যন্ত মোট আটটি ধাপ অনুসরণ করতে হবে।
প্রথম ধাপে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিদেশি কর্মী নিয়োগের অনুমোদন নিতে হবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত প্ল্যাটফর্মে সংশ্লিষ্ট পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে।
দ্বিতীয় ধাপে নিয়োগদাতাকে মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ওয়ান-স্টপ সেন্টারে বিদেশি কর্মীর কোটা চেয়ে আবেদন করতে হবে। অনলাইনে প্রয়োজনীয় নথি যাচাইয়ের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সাক্ষাৎকার নেবে এবং কোটা অনুমোদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে।
তৃতীয় ধাপে নিয়োগদাতাকে নির্ধারিত লেভি বা সরকারি ফি পরিশোধ করতে হবে। মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ ও মাইআইএমএমএস ব্যবস্থার মাধ্যমে এ অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
চতুর্থ ধাপে নিয়োগদাতাকে শর্তসাপেক্ষ অনুমোদনপত্র সংগ্রহ করতে হবে। মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ওয়ান-স্টপ সেন্টার ও নির্ধারিত সরকারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ অনুমোদন নিতে হবে।
পঞ্চম ধাপে কর্মীর নিজ দেশে অবস্থিত মালয়েশিয়ার দূতাবাস বা সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক মিশনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হবে।
ষষ্ঠ ধাপে কর্মীকে নিজ দেশ থেকে নিয়োগ এবং মালয়েশিয়ায় পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এ কাজ অনুমোদিত রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি বা সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে।
সপ্তম ধাপে বিদেশি কর্মীর জন্য ভিসা উইথ রেফারেন্স (VDR) সংগ্রহ করতে হবে।
অষ্টম ও শেষ ধাপে প্রয়োজনীয় সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করবেন। এর মধ্য দিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়ার নির্ধারিত ধাপ শেষ হবে।
অনুমোদিত এজেন্সির তথ্য কোথায়
মালয়েশিয়া সরকার নিয়োগদাতাদের বিদেশি কর্মী নিয়োগসংক্রান্ত নিয়ম, প্রয়োজনীয় তথ্য ও অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা জানতে দেশটির Foreign Workers Centralized Management System (FWCMS) পোর্টাল ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে।
মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের ২০২১ সালে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত রয়েছে। নানা অভিযোগ ও অনিয়মের পর ২০২৪ সালের জুনে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়। নতুন করে শ্রমবাজার চালুর ক্ষেত্রে বর্তমানে ওই সমঝোতা স্মারক অনুসরণ করা হচ্ছে। এর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন সমঝোতা বা চুক্তির বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
এদিকে শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেটের অভিযোগ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু হলে প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবেই পরিচালনা করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরেও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল। ফলে নতুন নির্দেশনার পর বাংলাদেশি কর্মীদের মালয়েশিয়ায় যাওয়ার প্রক্রিয়া কবে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়, সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্টদের।

