পার্বত্য জেলার বান্দরবানের লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে’ আড়াই লাখ মানুষের চিকিৎসার একমাত্র আশ্রয়স্থল ৫০ শয্যা বিশিষ্ট প্রতিনিয়ত বাড়ছে রোগীর চাপ। একদিকে জ্যামেতিক হারে রোগী বাড়ছে, অন্যদিকে কমে আসছে ঔষধের বরাদ্দ সহ জনবল। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তীব্র শয্যা সংকটে ৫০ শয্যার হাসপাতালে বর্তমানে ১০৯জন রোগী ভর্তি থাকায় নির্ধারিত শয্যার বাইরে অনেক রোগীকে মেঝে ও করিডোরে চিকিৎসা সেবা নিতে হচ্ছে। পাশাপাশি হাম ও ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথক ইউনিট পরিচালনা করায় হাসপাতালের ওপর তৈরি হয়েছে বাড়তি চাপ।হাসপাতালটিতে লামা উপজেলার ১টি পৌরসভা,০৮ টি ইউনিয়ন, আলীকদম উপজেলার চৈক্ষ্যং ও চকরিয়া উপজেলার বমু বিলছড়ি ইউনিয়ন সহ প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার জনগণের চিকিৎসা সেবা নিয়ে থাকে। হাসপাতাল ঘুরে জানা যায়, আন্তঃবিভাগে গত ২৯ আগস্ট ১১০ জন, ৩০ আগস্ট ১০৩ জন এবং ৩১ আগস্ট ১০৯ জন রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা সেবা নিচ্ছে। ৫০ শয্যার অনুকূলে দ্বি-গুণের বেশী রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে হিমসিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এছাড়া বহিঃবিভাগে প্রতিদিন গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ জন রোগী সেবা নিচ্ছে। ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশী রোগী আসায় উপযুক্ত সেবা দেয়া যাচ্ছেনা বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে প্রায় এক বছর ধরে ২টি অ্যাম্বুলেন্স নষ্ট থাকায় গুরুতর রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন ওয়ার্ডে নির্ধারিত শয্যার পাশাপাশি মেঝে ও বারান্দায় বিছানা পেতে রোগীদের রাখা হয়েছে। মেঝে করিডোরের পাশে রোগী শুয়ে আছেন, আবার কোথাও স্বজনদের নিয়ে অবস্থান করছেন। এতে একদিকে রোগীদের দুর্ভোগ বাড়ছে, অন্যদিকে চিকিৎসক, নার্স ও কর্মীদের স্বাভাবিক চলাচলেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই হাসপাতালটিতে রোগীর চাপ ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ৩১ আগস্টের তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু আক্রান্ত ১৩ জন এবং হাম আক্রান্ত ৭ জন রোগী চিকিৎসাধীন আছে। এছাড়া ডায়রিয়া, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীরাও হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।জনবল সংকট- লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আগস্ট মাসের তথ্য মতে, ৩৫ জন ডাক্তারের স্থলে ১৯ জন ডাক্তার আছে। কনসালটেন্ট ও সার্জন সহ বাকী পদ গুলো শূণ্য রয়েছে। ৩২ জন সিনিয়র স্টাফ নার্সের স্থলে ১২ জন নার্সের পদ শূণ্য রয়েছে। ল্যাব, রেডিওলজি, ফিজিওথেরাপি টেকনোলজিস্ট এর মত গুরুত্বপূর্ণ পদে জনবল নেই। এছাড়া স্বাস্থ্য সহকারী, অফিস সহায়ক, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, ওয়ার্ড বয়ের পদ খালি রয়েছে। লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. সোলায়মান আহমেদ বলেন, ‘শয্যা সংকটে রোগীর সেবা দেওয়া খুবই কঠিন। নির্ধারিত শয্যার তুলনায় রোগী বেশি থাকায় চিকিৎসা দেওয়া খুব কষ্ট হচ্ছে। রোগীর চাপ সামলাতে চিকিৎসক ও নার্সদের অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হচ্ছে। শয্যার সংকট থাকায় অনেক রোগীকে বাধ্য হয়ে মেঝেতে রাখতে হচ্ছে।’
ঔষধ সংকট- লামা হাসপাতালের এমএসআর এর তথ্য মতে গত অর্থবছরে (২০২৫-২৬) ঔষধ ক্রয়ে ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও এ অর্থবছরে (২০২৬-২৭) তা কমিয়ে দেয়া হয়েছে ৬৩ লাখ টাকা। বিশাল জনগোষ্ঠীর এই উপজেলায় যা অপ্রতুল।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ফাতেমা আক্তার, মনির হোসেন, শিশু রোগী আহিয়া ও নজরুল ইসলাম জানান, ‘তারা সিট না পেয়ে মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। হাসপাতাল থেকে কোন ঔষধপত্র দেয়া হচ্ছেনা, সব ঔষধ কিনতে হচ্ছে। রোগীর চাপ থাকায় টয়লেট ও হাসপাতালের পরিবেশ খুবই ময়লা আবর্জনা হয়ে গেছে। ডাক্তার নার্সরা রোগী দেখতে হিমসিম খাচ্ছে।লামা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. গোলাম মোস্তফা নাদিম বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্সের জন্য সিভিল সার্জন, জেলা পরিষদ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্স পাচ্ছি না। দ্রুত সময়ে লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ১০০ শয্যা করা না হলে জনবল ও ঔষধ সংকট কাটবেনা।দ্রুত সমাধানের দাবি- হাসপাতালে আগত রোগী ও স্থানীয়দের দাবি, রোগীর বর্তমান চাপ বিবেচনায় লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যা সংখ্যা বাড়িয়ে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল নিশ্চিত করার পাশাপাশি হাম ও ডেঙ্গু রোগীদের পৃথক চিকিৎসা ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে বন্ধ থাকা অ্যাম্বুলেন্স সেবা দ্রুত চালু করতে হবে বলে জানান তিনি।
কালের সমাজ/কে.পি

