এক সময় দূরপাল্লার বাসের স্টিয়ারিংয়ে ছুটে চলতেন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। জীবিকার তাগিদে দীর্ঘ ১৭ থেকে ১৮ বছর ঢাকা-রংপুর রুটে সাউদিয়া পরিবহনের বাস চালিয়েছেন। সেই মানুষটিই এখন ব্যস্ত সবুজের সঙ্গে। হাতে স্টিয়ারিংয়ের বদলে এখন ফলগাছের পরিচর্যার সরঞ্জাম। নিজের ভাগ্য বদলের পাশাপাশি অন্যদের কর্মসংস্থানের স্বপ্ন নিয়ে গড়ে তুলেছেন মিশ্র ফলের বাগান। বাসচালক থেকে হয়ে উঠেছেন সফল ও অনুকরণীয় ফল উদ্যোক্তা।
মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার বালিদিয়া ইউনিয়নের ছোট কলধারী গ্রামের সাইফুল শেখের ছেলে মো. মিজানুর রহমান। ২০২১ সালে চালকের পেশা ছেড়ে গ্রামে ফিরে নেন কৃষি উদ্যোগ। প্রথমে ১৮ শতক জমিতে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর থেকে সংগ্রহ করা বারি-১, বারি-২ এবং ভিয়েতনামী বারি-৩ ও বারি-৪ জাতের ৬০টি মাল্টার চারা রোপণ করেন। নিবিড় পরিচর্যায় পরের বছরই গাছে ফল আসে। প্রথম ফলনই তাকে নতুন করে স্বপ্ন দেখায়।
এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। গত পাঁচ বছরে নিজের এক বিঘা ও লিজ নেওয়া দেড় বিঘা জমিসহ মোট আড়াই বিঘা জমিতে গড়ে তুলেছেন তিনটি মিশ্র ফলের বাগান। এই ‘সবুজ ভুবন’ নিয়েই এখন তার স্বপ্ন। বর্তমানে বাগানে বারোমাসি মাল্টার পাশাপাশি রয়েছে বারি-১, বারি-২, ভিয়েতনামী বারি-৩ ও বারি-৪ জাতের মাল্টা। সঙ্গে চাষ হচ্ছে হাইব্রিড লেবু, পেঁপে, বেদানা, দার্জিলিং কমলা, চায়না কমলা ও ম্যান্ডারিন কমলা। মিজানুরের বাগানের ফল শুধু স্থানীয় বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি মাগুরা জেলা শহরেও এসব ফল বিক্রি করছেন তিনি। পাশাপাশি উন্নত জাতের ফলের চারাও উৎপাদন ও বিক্রি করেন। জাত ও মানভেদে বারি-১ ও বারি-২ জাতের মাল্টা বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ৬০ থেকে ৮০ টাকা এবং ভিয়েতনামী বারি-৩ ও বারি-৪ জাতের মাল্টা ১২০ থেকে ১৫০ টাকা দরে। গত বছর বাগান থেকে প্রায় দুই লাখ টাকার ফল ও চারা বিক্রি করেছেন মিজানুর।
চলতি বছর বাগান আরও পরিণত হওয়ায় ফল ও চারা মিলিয়ে প্রায় চার লাখ টাকা বিক্রির আশা করছেন তিনি। তবে মিজানুরের কাছে এই উদ্যোগ শুধু আয়-রোজগারের মাধ্যম নয়। নিজের মতো অন্য বেকার তরুণদেরও কৃষির দিকে আকৃষ্ট করতে চান তিনি। তার উদ্যোগ দেখে স্থানীয় অনেক তরুণ ফলচাষে আগ্রহী হচ্ছেন বলে জানান এলাকাবাসী। স্থানীয়দের ভাষ্য, পরিশ্রম, ধৈর্য ও সঠিক পরিকল্পনা থাকলে পেশা পরিবর্তন করেও সফল হওয়া সম্ভব। পতিত বা অব্যবহৃত জমিকে কাজে লাগিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি অন্যদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যায়। মিজানুর রহমান তারই বাস্তব উদাহরণ। এক সময় যে হাত দূরপাল্লার বাসের স্টিয়ারিং ধরে বহূ দূরের পথ পাড়ি দিত, সেই হাতেই এখন বেড়ে উঠছে সম্ভাবনার সবুজ ভুবন। মিজানুরের এই পরিবর্তন শুধু একটি পেশা বদলের গল্প নয়, বরং পরিকল্পিত কৃষি উদ্যোগে স্বাবলম্বী হওয়ার এক অনুপ্রেরণাদায়ী দৃষ্টান্ত। মো. মিজানুর রহমান বলেন, “মানুষের নিরাপদ ফলের চাহিদা মেটানো এবং স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই ছিল এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। শুরুতে নানা প্রতিবন্ধকতা ছিল। তবে মেধা, শ্রম ও ধৈর্য ধরে কাজ করায় আজ সাফল্য পেয়েছি। ভবিষ্যতে বাগানের পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।”
কালের সমাজ/কে.পি

