খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ায় স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
একই সঙ্গে বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. রুবেল আনছারের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তদন্তে পাঁচ সদস্যের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গতকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩৭তম সিন্ডিকেট সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সভা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এস এম মাহবুবুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
অধ্যাপক এস এম মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রেজাউল ইসলামকে স্থানীয়ভাবে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এ সিদ্ধান্ত দেশের সব পাবলিক–বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ সমগোত্রীয় প্রতিষ্ঠানে জানানো হবে বলেও সিন্ডিকেটে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এছাড়া অধ্যাপক রুবেল আনছারের বিরুদ্ধে নিরোধকেন্দ্রের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পৃথক পাঁচ সদস্যের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
রেজিস্ট্রারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অধ্যাপক রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন সংক্রান্ত অভিযোগ (কেস নং–৩১) তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ কেন্দ্রের গঠিত তদন্ত কমিটি ২৯ জুলাই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।
ওই প্রতিবেদনে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ‘উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ নীতিমালা, ২০০৮’-এর ধারা ৬.৩(ক) অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের ২৩৭তম সভার সিদ্ধান্ত নং–৮ অনুযায়ী নৈতিক অসচ্চরিত্রতার দায়ে অধ্যাপক রেজাউল ইসলামকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও নিরোধ কেন্দ্রের ২৩ ও ২৪ নম্বর অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনার ভিত্তিতে সিন্ডিকেট উচ্চপর্যায়ের পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও নিরোধ কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, ২৩ ও ২৪ নম্বর অভিযোগ বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক মো. রুবেল আনছারের বিরুদ্ধে। গত জুনের মাঝামাঝি সময়ে অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে এক শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীন বার্তা পাঠানোর অভিযোগ ওঠে।
এ ঘটনার পর তাকে ডিসিপ্লিন প্রধানের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পরে অভিযোগের তদন্ত শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও নিরোধ কেন্দ্রে।
অভিযোগের পর শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও অভিযুক্ত শিক্ষকের কুশপুত্তলিকা দাহ কর্মসূচি পালন করেন। তাদের অভিযোগ, অধ্যাপক রেজাউল ইসলাম মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপে এক শিক্ষার্থীকে উত্ত্যক্তমূলক ও অশালীন বার্তা পাঠিয়েছেন।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগীর পক্ষে বার্তার স্ক্রিনশটসহ লিখিত অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও নিরোধ কেন্দ্রে জমা দেওয়া হয়। এ বিষয়ে জানতে রেজাউল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
এদিকে সম্প্রতি রেজাউল ইসলাম ও রুবেল আনছারের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি এবং বিজয়-২৪ হলের এক ক্যানটিনকর্মীর বিরুদ্ধে গোপনে ছাত্রীদের ভিডিও ধারণের অভিযোগের বিচার দাবিতে শিক্ষার্থীরা অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস-পরীক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বর্জনের ঘোষণা দেন।
গত ২৩ জুলাই তারা প্রশাসনিক ও একাডেমিক ভবনগুলোয় তালা ঝুলিয়ে দেন। পরে ২৬ জুলাই সকালে তালা খুলে দেওয়া হলেও ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীরা তিন দফা দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলো হলো বিজয়-২৪ হলের ছাত্রীদের ভিডিও ধারণের অভিযোগে অভিযুক্ত ক্যানটিনকর্মী ইমাম হাসানের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট হল প্রভোস্ট বডিকে জবাবদিহির আওতায় আনা।
যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রুবেল আনছার ও অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রেজাউল ইসলামকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা এবং সম্প্রতি গঠিত স্পন্দন-২৪ ক্লাবের নিবন্ধন বাতিল করা। শিক্ষার্থীরা ক্লাবটি গঠনের প্রক্রিয়া ও উদ্দেশ্য নিয়ে অভিযোগ করেছে।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের আগস্টে বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. রুবেল আনছারের বিরুদ্ধে দুই ছাত্রীর যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে। একটি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেলেও অন্য অভিযোগে তাকে দুই বছরের জন্য সব একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
কালের সমাজ/এ এইচবি

