দীর্ঘ সময়ের সীমাবদ্ধতার পর বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভারতের ভিসা কার্যক্রম ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করার সুপারিশ করেছে ভারতের সংসদের পররাষ্ট্রবিষয়ক স্থায়ী কমিটি। এই সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা ও পারিবারিক প্রয়োজনে ভারতগামী বাংলাদেশিদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তি ফিরে আসতে পারে। একই সঙ্গে এটি দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ভারতের সংসদীয় কমিটির মতে, দীর্ঘদিন ভিসা কার্যক্রম সীমিত থাকায় দুই দেশের সাধারণ মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ কমেছে। এতে শুধু ভ্রমণই নয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও প্রভাবিত হয়েছে। তাই নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ ভিসা কার্যক্রম চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক (People-to-People Contact) দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি। ভিসা জটিলতা দীর্ঘমেয়াদে পারস্পরিক বিশ্বাস ও ইতিবাচক ধারণাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
কী কী পদক্ষেপের সুপারিশ?
সংসদীয় কমিটি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে—
পরিস্থিতি অনুকূলে এলে ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ ভিসা কার্যক্রম চালু করা।
নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কনস্যুলার সেবা সম্প্রসারণ।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নিয়মিত কনস্যুলার সহযোগিতা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
ভিসানীতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা।
আবেদনকারীদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা।
বৈধ ভ্রমণকারীদের অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি কমানো।
কেন সীমিত করা হয়েছিল ভিসা?
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে ভিসা কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করা হয়। একই সময়ে নিরাপত্তার স্বার্থে কনস্যুলার কর্মীদের একটি অংশও প্রত্যাহার করা হয়েছিল।
বর্তমানে বাংলাদেশের পাঁচটি ভারতীয় ভিসা কেন্দ্রে প্রতিদিন প্রায় ১,৫০০টি ভিসা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই চিকিৎসা ভিসা, যা থেকে বোঝা যায় স্বাস্থ্যসেবার জন্য ভারত এখনও বাংলাদেশিদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য।
বাংলাদেশিদের জন্য কী হতে পারে সুফল?
ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক হলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন—
চিকিৎসাপ্রার্থী রোগী ও তাদের স্বজনেরা।
ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ও ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা।
ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা।
আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া সাধারণ ভ্রমণকারীরা।
পর্যটন ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ে আগ্রহীরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিসা সহজ হলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, পর্যটন ও শিক্ষা খাতে নতুন গতি সৃষ্টি হতে পারে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক। সীমান্ত, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যোগাযোগ ও নিরাপত্তা সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়া শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি ভবিষ্যৎ সম্পর্কের প্রতি আস্থারও প্রতিফলন হতে পারে।
তবে সংসদীয় কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নের ওপর।
ভারতের সংসদীয় কমিটির এই সুপারিশ বাংলাদেশিদের জন্য আশাব্যঞ্জক বার্তা বহন করছে। যদিও এখনই পূর্ণাঙ্গ ভিসা কার্যক্রম চালুর ঘোষণা আসেনি, তবুও ধাপে ধাপে স্বাভাবিক করার উদ্যোগ ভবিষ্যতে দুই দেশের জনগণের যোগাযোগ আরও সহজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে চিকিৎসা, শিক্ষা ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হাজারো মানুষের জন্য এটি হতে পারে স্বস্তির নতুন দিগন্ত।
কালের সমাজ/ এএইচবি

