ঢাকা মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

বর্ষায় চলনবিল ঘুরতে জমে উঠেছে সিংড়া নৌকা ঘাট

সিংড়া (নাটোর) প্রতিনিধি | জুলাই ২৮, ২০২৬, ০৫:১২ পিএম বর্ষায় চলনবিল ঘুরতে জমে উঠেছে  সিংড়া নৌকা ঘাট

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নীলা ভূমি চলনবিল। দেশের সবচেয়ে বড় এই বিলে এখন বর্ষার পানিতে থৈ থৈ করছে চারপাশ।
দিগন্তজোড়া জলরাশির বুকে বাতাসের ছোট ছোট ঢেউ আর নীল আকাশের হাতছানি—এ রূপসী চলনবিলের চিরচেনা রূপ। বর্ষার শুরুতেই এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে নাটোরের সিংড়ায় উপচে পড়ছে দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের ভিড়। উপজেলা সদর থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ‘সিংড়া পেট্রো বাংলা পয়েন্ট নৌকার ঘাট’ এখন দর্শনার্থী আর ভ্রমণপিপাসুদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।

​সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সূর্য ওঠার পর থেকেই জমজমাট হয়ে ওঠে এই নৌকা ঘাট। রাজশাহী, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ছোট-বড় দল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী কিংবা সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে আসা শত শত মানুষ প্রথমে এসে জড়ো হন সিংড়া পয়েন্টে। সেখান থেকে পছন্দমতো নৌকা ভাড়া করে তারা ভেসে পড়ছেন বিলের বুকেই—ছুটে যাচ্ছেন বিলসা, কুন্দইল ব্রিজ, বিশ্বরোডের ৯ নম্বর ব্রিজ কিংবা ঐতিহাসিক তিশিখালী মাজারে।

​বর্তমানে ঘাটে শতাধিক ইঞ্জিনচালিত শ্যালো নৌকা, ছোট ঠেলার ডিঙি নৌকা এবং নান্দনিকভাবে সাজানো পিকনিকের বিশেষ নৌকা নোঙর করা রয়েছে। ভাড়ার তালিকাও বেশ সুনির্দিষ্ট। সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য তিশিখালী মাজারের জনপ্রতি ভাড়া রাখা হচ্ছে ৩০ টাকা। আর পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের নিয়ে রিজার্ভ নৌকায় তিশিখালী আসা-যাওয়ার ভাড়া পড়ছে ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা। এ ছাড়া দিনব্যাপী পিকনিক বা দীর্ঘ ভ্রমণের জন্য বড় নৌকা ৫,০০০ থেকে ৭,০০০ টাকা এবং মাঝারি সাইজের নৌকা ৪,০০০ থেকে ৬,০০০ টাকায় ভাড়া পাওয়া যাচ্ছে। ঘণ্টাভিত্তিক ছোট নৌকার চাহিদাও কম নয়।

​ছুটির দিন শুক্র ও শনিবারে এই ঘাটে মানুষের সমাগম সামলানো দায় হয়ে পড়ে। ফলে পর্যটকদের আনন্দের সাথে বাড়ে নৌকার ভাড়াও। তবে এতে ভাঁটা পড়ে না ভ্রমণপিপাসুদের উৎসাহে।

​রাজশাহী থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী আনিসুর রহমান বলেন:

​"কাজের ব্যস্ততায় তো শহরের চার দেয়ালে বন্দি থাকি। বর্ষায় চলনবিলের এ উন্মুক্ত রূপ আর মৃদু বাতাস সব ক্লান্তি এক নিমিষেই দূর করে দেয়। পরিবার নিয়ে সিংড়া ঘাটে এসে খুব সহজেই মনের মতো নৌকা পেয়েছি।"

​পর্যটকদের এই ঢলে দারুণ ব্যস্ত ও আনন্দিত স্থানীয় মাঝিরাও। বছরের অন্য সময় অলস দিন কাটলেও এখন তাদের দম ফেলার সুযোগ নেই। পাশের কয়রা বাড়ি গ্রামের নৌকার  মাঝি  সুজন আলী বলেন:

​"বর্ষা এলেই আমাদের কপাল খোলে। প্রতিদিন শত শত মানুষ বিল দেখতে আসে। শুক্র-শনিবার একটু ভিড় বেশি হয়, আয়-রোজগারও ভালো হয়। আমরাও চেষ্টা করি পর্যটকদের নিরাপদে ঘুরিয়ে দেখাতে।"

​এদিকে পর্যটকদের আগমনকে কেন্দ্র করে ঘাট সংলগ্ন দোকানপাটেও এখন বেচাকেনার ধুম। জমে উঠেছে চটপটি, ফুচকা, ঝালমুড়ি আর রকমারি টক-মিষ্টির দোকান। চা-স্টল থেকে শুরু করে গামছা ও কাপড়ের ব্যবসায়ীদের মুখে এখন চওড়া হাসি।

​ঘাট এলাকার কফিহাউজের স্বত্বাধিকারী মোঃ আব্দুল আল মামুন বলেন,
​"পর্যটক বাড়ায় আমাদের দোকানে কেনাকাটা অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে ফুচকা আর চায়ের দোকানে সারাদিনই লাইন লেগে থাকে। বিলের হাওয়া খেতে এসে মানুষ কেনাকাটাও করছে বেশ।"
কাপড় ব্যবসায়ি আব্দুল কাদের বলেন, দোকানে গামছা বিক্রি হচ্ছে বেশি। হাফ প্যান্ট ও কোয়ার্টার প্যান্টের পাশাপাশি অনটাইম স্যান্ডেল এর বেচাকেনা বেড়েছে। ধীরে ধীরে মিনি কক্সবাজারে পরিনত হচ্ছে এই নৌকার ঘাট।

​চলনবিলের এ বর্ষার আমেজ ও সিংড়া পেট্রো বাংলা পয়েন্টের প্রাণচাঞ্চল্য জানান দিচ্ছে—প্রকৃতির রূপ আর মানুষের আনন্দের মিলনে চলনবিল এখন এক অনন্য পর্যটনকেন্দ্র।

কালের সমাজ/কে.পি

গ্রাম-গঞ্জ বিভাগের আরো খবর

Link copied!