ঢাকা মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
আলো-ছায়ার এক শতকের অভিযাত্রা

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র: জন্ম, সংগ্রাম, স্বর্ণযুগ, মুক্তিযুদ্ধ ও বিশ্বমঞ্চে আত্মপ্রকাশ

মোহাম্মদ আলী সুমন, চান্দিনা (কুমিল্লা) | জুলাই ২৮, ২০২৬, ০৫:৩০ পিএম বাংলাদেশের চলচ্চিত্র: জন্ম, সংগ্রাম, স্বর্ণযুগ, মুক্তিযুদ্ধ ও বিশ্বমঞ্চে আত্মপ্রকাশ

কোনো জাতির চলচ্চিত্র শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি সেই জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি, স্বপ্ন, সংগ্রাম এবং আত্মপরিচয়ের এক জীবন্ত দলিল। সাহিত্য যেমন একটি জাতির মননকে ধারণ করে, চলচ্চিত্র তেমনি সেই মননের দৃশ্যরূপ।

 বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসও ঠিক তেমনই-আলো-ছায়ার ফ্রেমে বন্দী একটি জাতির দীর্ঘ পথচলার কাহিনি। প্রায় এক শতাব্দীর এই অভিযাত্রায় রয়েছে অসংখ্য স্বপ্ন, সীমাহীন প্রতিবন্ধকতা, সাহসী উদ্যোগ, শিল্পের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা এবং সময়কে অতিক্রম করে বেঁচে থাকা অসংখ্য সৃষ্টির গল্প।
আজকের ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর চলচ্চিত্র শিল্পের দিকে তাকালে হয়তো কল্পনাও করা কঠিন, একসময় এই ভূখণ্ডে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ ছিল প্রায় অসম্ভব এক স্বপ্ন। না ছিল আধুনিক ক্যামেরা, না ছিল স্টুডিও, ল্যাবরেটরি কিংবা প্রশিক্ষিত জনবল। তবু কিছু সংস্কৃতিমনা মানুষ বিশ্বাস করেছিলেন-বাংলার মানুষ নিজেদের গল্প নিজেরাই বলবে। সেই বিশ্বাস থেকেই শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রথম অধ্যায়।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্ম হয় ১৯২৭-২৮ সালে ঢাকায়। নবাব পরিবারের কয়েকজন সংস্কৃতিপ্রেমী তরুণের উদ্যোগে নির্মিত হয় ‘সুকুমারী’, যা এ ভূখণ্ডে নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেয়। ছবিটির পরিচালক ছিলেন জগন্নাথ কলেজের তৎকালীন ক্রীড়া শিক্ষক অম্বুজপ্রসন্ন গুপ্ত। নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেন খাজা নসরুল্লাহ এবং নারী চরিত্রে অভিনয় করেন সৈয়দ আবদুস সোবহান। কারণ, সে সময় সমাজে নারীদের অভিনয় ছিল প্রায় নিষিদ্ধ; এমনকি নাট্যমঞ্চেও নারী চরিত্রে অভিনয় করতেন পুরুষরাই। তাই ‘সুকুমারী’ শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়, বরং তৎকালীন সমাজব্যবস্থার একটি ঐতিহাসিক দলিল।
এর কিছুদিন পর ঢাকার নবাব পরিবারের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ইস্ট বেঙ্গল সিনেমাটোগ্রাফ কোম্পানি। এই প্রতিষ্ঠানই নির্মাণ করে বাংলাদেশের প্রথম নির্বাক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দ্য লাস্ট কিস’। পরিচালনায় ছিলেন অম্বুজপ্রসন্ন গুপ্ত। অভিনয়ে অংশ নেন খাজা আজমল, খাজা আদিল, খাজা আকমল, খাজা শাহেদ, খাজা নসরুল্লাহ এবং শৈলেন রায় (টোনা বাবু)।
তবে এই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল-প্রথমবারের মতো নারী চরিত্রে প্রকৃত নারীদের অংশগ্রহণ। সে সময় সমাজের রক্ষণশীলতার কারণে কোনো সম্ভ্রান্ত পরিবারের নারী অভিনয়ে আসতে রাজি হননি। ফলে লোলিটা (বুড়ি), চারুবালা, দেববালা (দেবী) এবং হরিমতী নামের কয়েকজন নারী এই সাহসী পদক্ষেপ নেন। তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্য। কিন্তু ইতিহাসের নির্মোহ বিচার বলে, তাঁদের হাত ধরেই বাংলাদেশে নারী অভিনয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল।
১৯৩১ সালে ঢাকার মুকুল হলে (বর্তমান আজাদ হল) মুক্তি পায় ‘দ্য লাস্ট কিস’। এর উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার। সেই প্রিমিয়ার শো শুধু একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ছিল না; এটি ছিল এ ভূখণ্ডে চলচ্চিত্র সংস্কৃতির আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে মুসলিম নির্মাতাদের পথচলাও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশিষ্ট সাংবাদিক ওবায়েদ-উল হক, হিমাদ্রী চৌধুরী ছদ্মনামে ১৯৪৬ সালে নির্মাণ করেন ‘দুঃখে যাদের জীবন গড়া’। কলকাতায় নির্মিত হলেও এটি বাংলাদেশি মুসলিম পরিচালকের নির্মিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃত। একই ধারাবাহিকতায় ইসমাইল মোহাম্মদ, উদয়ন চৌধুরী ছদ্মনামে নির্মাণ করেন ‘মানুষের ভগবান’ (১৯৪৭)। দেশভাগের পর এই নির্মাতারাই ঢাকায় ফিরে এসে চলচ্চিত্র নির্মাণের নতুন পরিবেশ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
বাংলাদেশে তথ্যচিত্র নির্মাণের সূচনাও ঘটে স্বাধীনতার বহু আগে। ১৯৪৮ সালে নাজীর আহমদ নির্মাণ করেন ‘ইন আওয়ার মিডস্ট’, যা এ ভূখণ্ডের প্রথম তথ্যচিত্র হিসেবে স্বীকৃত। ভাষা আন্দোলনের পর সাংস্কৃতিক জাগরণের অংশ হিসেবে ১৯৫৩ সালে সরকারি জনসংযোগ বিভাগের অধীনে গঠিত হয় চলচ্চিত্র ইউনিট। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫৪ সালে নাজীর আহমদের পরিচালনায় নির্মিত হয় প্রামাণ্যচিত্র ‘সালামত’।
নাজীর আহমদ ছিলেন একাধারে অভিনেতা, লেখক, বেতারকর্মী ও চলচ্চিত্র সংগঠক। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের স্থপতি শিল্পী হামিদুর রহমান ছিলেন তাঁর সহোদর। ১৯৫৫ সালে তাঁর উদ্যোগে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম ফিল্ম ল্যাবরেটরি এবং আধুনিক চলচ্চিত্র স্টুডিও। পরবর্তীতে তিনি পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থার (ইপিএফডিসি) প্রথম নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর গল্প অবলম্বনে নির্মিত ‘আসিয়া’ আজও বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।
১৯৫৪ সালেই গঠিত হয় ইকবাল ফিল্মস এবং কো-অপারেটিভ ফিল্ম মেকার্স লিমিটেড। এই দুই প্রতিষ্ঠানের হাত ধরেই বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ও শিল্পধারার চলচ্চিত্র নির্মাণের ভিত্তি সুদৃঢ় হতে শুরু করে। ইকবাল ফিল্মসের ব্যানারে আবদুল জব্বার খান শুরু করেন এ ভূখণ্ডের প্রথম সবাক বাংলা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এর নির্মাণকাজ।
অবশেষে ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট মুক্তি পায় ‘মুখ ও মুখোশ’-যে দিনটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক। পরিচালক আবদুল জব্বার খান নিজেই এতে নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেন এবং নায়িকা ছিলেন পূর্ণিমা সেন। ছবিটির সংগীত পরিচালনা করেন সমর দাস, কণ্ঠ দেন আবদুল আলীম ও মাহবুবা হাসানাত। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও চলচ্চিত্রটি প্রমাণ করে-বাংলার মানুষ নিজেদের ভাষায়, নিজেদের গল্প নিয়ে পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র নির্মাণে সক্ষম।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয় ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল। তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (ইপিএফডিসি) প্রতিষ্ঠার বিল উত্থাপন করেন। এই প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়। পরবর্তী কয়েক দশক ধরে এফডিসি হয়ে ওঠে দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের প্রাণকেন্দ্র; এখান থেকেই জন্ম নেয় অসংখ্য কালজয়ী চলচ্চিত্র, কিংবদন্তি পরিচালক, অভিনেতা এবং শিল্পীর। কয়েক বছরের মধ্যেই তেজগাঁওয়ের স্টুডিও চত্বর পরিণত হয় সৃজনশীল মানুষদের মিলনমেলায়। এখান থেকেই জন্ম নেয় এমন এক চলচ্চিত্রধারা, যা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।
১৯৫৬ সালে ‘মুখ ও মুখোশ’ মুক্তির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) চলচ্চিত্র শিল্প আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করলেও প্রকৃত অর্থে শিল্পমানসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাণের নতুন অধ্যায় শুরু হয় পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (ইপিএফডিসি) প্রতিষ্ঠার পর। সেই শুরু থেকেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের মূল শক্তি ছিল মানুষের জীবন, সমাজ, নদী, মাটি, সংগ্রাম এবং স্বপ্ন। এ কারণেই নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলা চলচ্চিত্র কেবল একটি শিল্পমাধ্যম হয়ে থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছে একটি জাতির আত্মপরিচয়ের আয়না।
শিল্পমানের প্রথম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় ১৯৫৯ সাল। এ বছর ছিল পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্রের জন্য এক ঐতিহাসিক বছর। এ বছর মুক্তি পায় ফতেহ লোহানীর ‘আকাশ আর মাটি’, মহিউদ্দিনের ‘মাটির পাহাড়’, এহতেশামের ‘এদেশ তোমার আমার’ এবং এ. জে. কারদারের উর্দু চলচ্চিত্র ‘জাগো হুয়া সাভেরা’।
এর মধ্যে ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ ছিল আন্তর্জাতিক মানের এক অনন্য সৃষ্টি। কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস ‘পদ্মানদীর মাঝি’ অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্র পূর্ব বাংলার জেলে জীবনের বাস্তবতা বিশ্বদরবারে তুলে ধরে। যদিও বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়নি, তবু আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসিত হয়ে এটি বাংলা চলচ্চিত্রকে বিশ্বমানচিত্রে পরিচিত করে। এই ছবির প্রধান সহকারী পরিচালক ছিলেন পরবর্তীকালের কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে ফতেহ লোহানী এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। অভিনেতা, পরিচালক, নাট্যকার, লেখক ও বেতার ব্যক্তিত্ব-সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তিনি ছিলেন একজন আধুনিক চলচ্চিত্রচিন্তার মানুষ। ১৯৬০ সালে তাঁর নির্মিত ‘আসিয়া’ গ্রামবাংলার জীবন, মানুষের সংগ্রাম এবং সামাজিক বৈষম্যকে গভীর মানবিকতায় তুলে ধরে। ব্যবসায়িকভাবে খুব সফল না হলেও এটি প্রেসিডেন্ট পুরস্কার ও নিগার পুরস্কার অর্জন করে এবং চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের কাছে বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
ষাটের দশকে এহতেশাম বাংলা চলচ্চিত্রে আধুনিক শহুরে জীবনকে নতুনভাবে তুলে ধরেন। তাঁর ‘রাজধানীর বুকে’, ‘এদেশ তোমার আমার’ প্রভৃতি চলচ্চিত্রে মধ্যবিত্ত মানুষের স্বপ্ন, প্রেম, সংকট ও সমাজবাস্তবতা ফুটে ওঠে। পরবর্তীকালে তিনিই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে বহু জনপ্রিয় শিল্পীকে পরিচিত করে তোলেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের অন্যতম সফল নির্মাতা হিসেবে কাজ করেন।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে জহির রায়হান শুধু একজন পরিচালক নন; তিনি ছিলেন সময়ের বিবেক। ১৯৬১ সালে ‘কখনো আসেনি’ নির্মাণের মাধ্যমে পরিচালনায় আত্মপ্রকাশ করে তিনি একের পর এক সৃষ্টি করেন ‘সোনার কাজল’, ‘কাচের দেয়াল’, ‘সঙ্গম’, ‘বাহানা’, ‘আনোয়ারা’ এবং সর্বোপরি ‘জীবন থেকে নেয়া’।
১৯৭০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘জীবন থেকে নেয়া’ বাংলাদেশের রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। একটি পরিবারের গল্পের মধ্য দিয়ে তিনি তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক শাসনের স্বৈরাচারী চরিত্রকে রূপকভাবে তুলে ধরেন। চলচ্চিত্রটি মুক্তির পরপরই এটি গণআন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে জহির রায়হান ক্যামেরা হাতে বিশ্ববাসীর সামনে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার নির্মম চিত্র তুলে ধরেন। তাঁর নির্মিত ‘স্টপ জেনোসাইড’ আজও বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী যুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। এছাড়া ‘এ স্টেট ইজ বর্ন’ এবং অসমাপ্ত ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র দলিল।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে যাঁদের অবদান একাধিক ক্ষেত্রে সমান উজ্জ্বল, তাঁদের মধ্যে অন্যতম খান আতাউর রহমান। তিনি ছিলেন পরিচালক, অভিনেতা, কাহিনীকার, গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী। ‘অনেক দিনের চেনা’, ‘রাজ সন্ন্যাসী’, ‘আবার তোরা মানুষ হ’, ‘সুজন সখী’, ‘দিন যায় কথা থাকে’, ‘ছুটির ঘণ্টা’-প্রতিটি চলচ্চিত্রেই তিনি সমাজ, পরিবার ও মানবিক মূল্যবোধকে গভীর শিল্পবোধের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে ‘ছুটির ঘণ্টা’ এখনও বাংলাদেশের অন্যতম হৃদয়স্পর্শী চলচ্চিত্র হিসেবে দর্শকদের আবেগে বেঁচে আছে।
চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, ষাটের দশক ছিল পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম স্বর্ণযুগ। এই সময় সালাহউদ্দিন নির্মাণ করেন ‘যে নদী মরুপথে’, ‘সূর্যস্নান’, ‘ধারাপাত’-যেখানে সমাজ, মানবিকতা ও বাস্তব জীবন ছিল প্রধান উপজীব্য। অন্যদিকে বাণিজ্যিক ও শিল্পধারার মধ্যে এক ভারসাম্য তৈরি হয়। বাংলা চলচ্চিত্র ধীরে ধীরে নিজস্ব ভাষা, নান্দনিকতা এবং দর্শকগোষ্ঠী তৈরি করতে সক্ষম হয়।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার সংগ্রাম ছিল না; এটি ছিল সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইও। যুদ্ধের সময় চলচ্চিত্র নির্মাতারা অস্ত্রের পাশাপাশি ক্যামেরাকেও ব্যবহার করেছেন সত্য প্রকাশের হাতিয়ার হিসেবে। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের চলচ্চিত্র বিভাগের দায়িত্ব পালন করেন আবদুল জব্বার খান। অন্যদিকে জহির রায়হানের ‘স্টপ জেনোসাইড’ বিশ্ববিবেককে নাড়িয়ে দেয়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা, শরণার্থীদের দুর্ভোগ এবং মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব চিত্র আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরতে এই প্রামাণ্যচিত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও চলচ্চিত্রকর্মীরা বিশ্বাস হারাননি। তাঁদের প্রত্যাশা ছিল-স্বাধীন বাংলাদেশে চলচ্চিত্র হবে স্বাধীন মানুষের কণ্ঠস্বর, ইতিহাসের দলিল এবং নতুন সমাজ নির্মাণের শক্তিশালী মাধ্যম। স্বাধীনতার পর সেই প্রত্যাশাকে বাস্তবে রূপ দিতে এগিয়ে আসেন আলমগীর কবির, আমজাদ হোসেন, নারায়ণ ঘোষ মিতা, সুভাষ দত্ত, ঋত্বিক ঘটক, চাষী নজরুল ইসলাম, আবদুল্লাহ আল মামুনসহ একদল প্রতিভাবান নির্মাতা। তাঁদের হাত ধরেই শুরু হয় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের আরেকটি স্বর্ণালি অধ্যায়।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ তখন ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন রাষ্ট্র গঠনের সংগ্রামে ব্যস্ত। ভেঙে পড়েছিল অর্থনীতি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল অবকাঠামো, বিপর্যস্ত হয়েছিল শিল্প-সংস্কৃতির প্রায় সব ক্ষেত্র। কিন্তু ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও থেমে থাকেনি সৃজনশীলতা। বরং স্বাধীনতার চেতনা, মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং নতুন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সামনে খুলে দেয় এক নতুন দিগন্ত। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে শুরু হয় শিল্পসচেতন, সমাজমনস্ক এবং আন্তর্জাতিক মানের চলচ্চিত্র নির্মাণের এক নবজাগরণ।
মুক্তিযুদ্ধের ঠিক পরের সময়টাতেই চলচ্চিত্রে উঠে আসে যুদ্ধের ক্ষত, মানুষের বেদনা, স্বপ্নভঙ্গ, ভালোবাসা এবং পুনর্গঠনের গল্প। এই সময়ের অন্যতম প্রধান নির্মাতা আলমগীর কবির। সাংবাদিক, লেখক, চলচ্চিত্র-গবেষক এবং নির্মাতা-সব পরিচয়ের সমন্বয়ে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের আধুনিক চলচ্চিত্র আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ।
তাঁর নির্মিত ‘ধীরে বহে মেঘনা’ (১৯৭৩) মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী মানুষের মানসিক সংকট, মানবিক সম্পর্ক এবং নতুন বাংলাদেশের বাস্তবতাকে গভীর শিল্পবোধে তুলে ধরে। এরপর ‘সূর্য কন্যা’ (১৯৭৬), ‘সীমানা পেরিয়ে’ (১৯৭৭), ‘রূপালী সৈকতে’ (১৯৭৯), ‘মোহনা’ (১৯৮২), ‘পরিণীতা’ (১৯৮৪) এবং ‘মহানায়ক’ (১৯৮৫) নির্মাণের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন-বাংলাদেশের চলচ্চিত্রও বিশ্বমানের নন্দনতত্ত্ব ধারণ করতে পারে।
স্বাধীনতার পরের দশকে চলচ্চিত্রে একদিকে যেমন সমাজবাস্তবতার শক্তিশালী ধারা গড়ে ওঠে, অন্যদিকে দর্শকপ্রিয়তাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই ভারসাম্যই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
১৯৭২ সালে ঋত্বিক ঘটকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ বাংলা চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক শিল্পভাষার সঙ্গে যুক্ত করে। একই সময়ে জহিরুল হকের ‘রংবাজ’, সুভাষ দত্তের ‘বলাকা মন’ এবং অন্যান্য নির্মাতার কাজ চলচ্চিত্রকে বহুমাত্রিক রূপ দেয়।
১৯৭৪ সালে নারায়ণ ঘোষ মিতা নির্মাণ করেন ‘আলোর মিছিল’-যেখানে স্বাধীন দেশের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও সামাজিক পরিবর্তনের চিত্র ফুটে ওঠে। পরের বছর তাঁর ‘লাঠিয়াল’ এবং খান আতাউর রহমানের ‘সুজন সখী’ গ্রামীণ সমাজ, লোকসংস্কৃতি ও মানবিক সম্পর্ককে নতুনভাবে দর্শকের সামনে তুলে ধরে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে ১৯৭৬ সালকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ করা হয়। এই বছরে মুক্তি পাওয়া একাধিক চলচ্চিত্র শিল্পমানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। রাজেন তরফদারের ‘পালঙ্ক’, হারুনর রশীদের ‘মেঘের অনেক রঙ’, আলমগীর কবিরের ‘সূর্য কন্যা’, কবীর আনোয়ারের ‘সুপ্রভাত’, আবদুস সামাদের ‘সূর্যগ্রহণ’ এবং আমজাদ হোসেনের ‘নয়নমণি’ প্রমাণ করে-বাংলাদেশের চলচ্চিত্র কেবল বিনোদন নয়, সমাজ-সংস্কৃতি ও মানবজীবনের গভীর শিল্পভাষাও হতে পারে।
১৯৭৭ সালে ‘সীমানা পেরিয়ে’ এবং ‘বসুন্ধরা’ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে প্রশংসা অর্জন করে। ১৯৭৮ সালে আমজাদ হোসেনের ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ এবং আবদুল্লাহ আল মামুনের ‘সারেং বৌ’ দর্শকপ্রিয়তার পাশাপাশি শিল্পমূল্যের জন্যও বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে ১৯৭৯ সাল এক অনন্য মাইলফলক। এ বছর মসিউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলী যৌথভাবে নির্মাণ করেন ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’। আবু ইসহাকের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্র গ্রামীণ দারিদ্র্য, কুসংস্কার, নারীর সংগ্রাম এবং সামাজিক বৈষম্যকে অসাধারণ শিল্পগুণে উপস্থাপন করে। এটি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয় এবং বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে বিশ্বমঞ্চে নতুন মর্যাদা এনে দেয়। অনেক চলচ্চিত্র গবেষকের মতে, ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।
আশির দশকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে একদিকে যেমন জনপ্রিয় বাণিজ্যিক ধারার বিস্তার ঘটে, অন্যদিকে সমান্তরালভাবে চলতে থাকে শিল্পধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাণ। চাষী নজরুল ইসলাম এই সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা। তাঁর ‘দেবদাস’, ‘চন্দ্রনাথ’, ‘শুভদা’, ‘হাসন রাজা’সহ একাধিক চলচ্চিত্র বাংলা সাহিত্যকে চলচ্চিত্রে রূপান্তরের সফল উদাহরণ হয়ে আছে।
একই সময়ে আমজাদ হোসেন নির্মাণ করেন ‘কসাই’, ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’, ‘ভাত দে’, ‘সখিনার যুদ্ধ’-যেখানে গ্রামীণ জীবন, দরিদ্র মানুষের সংগ্রাম এবং সামাজিক বৈষম্য গভীর মানবিকতায় ফুটে ওঠে।
সুভাষ দত্ত, সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকী, আবদুল্লাহ আল মামুন, বুলবুল আহমেদ, কাজী হায়াৎ, আখতারুজ্জামান, কামাল আহমেদ, মতিন রহমান, মোস্তফা আনোয়ারসহ অসংখ্য নির্মাতা এই সময় চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেন। তাঁদের নির্মিত চলচ্চিত্রে প্রেম, পরিবার, সমাজ, রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ, গ্রামবাংলা ও নাগরিক জীবনের নানা দিক উঠে আসে।
নব্বইয়ের দশকে বিশ্বায়ন, স্যাটেলাইট টেলিভিশন এবং প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। একদিকে ভিডিও পাইরেসি, অন্যদিকে প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা কমে যাওয়া, বিনিয়োগ সংকট এবং মানসম্মত চিত্রনাট্যের অভাব চলচ্চিত্র শিল্পকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেয়। তবুও এই সময়েও কিছু নির্মাতা শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে অসাধারণ কাজ করে গেছেন।
নতুন সহস্রাব্দে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আবারও বিশ্বদরবারে আলোচিত হতে শুরু করে। তারেক মাসুদ নির্মিত ‘মাটির ময়না’ (২০০২) কান চলচ্চিত্র উৎসবের ডিরেক্টরস ফোর্টনাইট বিভাগে নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব সমাজ, ধর্মীয় শিক্ষা, শৈশব এবং মানবিক মূল্যবোধের অনন্য উপস্থাপনার জন্য চলচ্চিত্রটি বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়।
একই সময়ে তানভীর মোকাম্মেলের ‘লালন’, মোরশেদুল ইসলামের ‘দুখাই’, ‘লালসালু’, আখতারুজ্জামানের ‘পোকামাকড়ের ঘরবসতি’, কাজী মোরশেদের ‘ঘানি’সহ আরও অনেক চলচ্চিত্র বাংলাদেশের শিল্পধর্মী সিনেমাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের শতবর্ষের এই ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্জন হলো-এ দেশের নির্মাতারা বারবার প্রমাণ করেছেন, সীমিত সম্পদ দিয়েও বিশ্বমানের চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব। জহির রায়হানের প্রতিবাদ, ফতেহ লোহানীর মানবিকতা, খান আতাউর রহমানের শিল্পবোধ, আলমগীর কবিরের নন্দনতত্ত্ব, চাষী নজরুল ইসলামের সাহিত্যচর্চা, আমজাদ হোসেনের জনজীবনের গল্প এবং তারেক মাসুদের বিশ্বদৃষ্টিই আজকের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অনুপ্রেরণা।
তবে সামনে রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জও। এক সময় দেশের পাঁচ শতাধিক প্রেক্ষাগৃহ দর্শকে মুখর থাকলেও বর্তমানে তার বড় অংশই বন্ধ হয়ে গেছে। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, ডিজিটাল প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এবং দর্শকের রুচির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলচ্চিত্র শিল্পকে নতুনভাবে দাঁড়াতে হবে। প্রয়োজন মৌলিক গল্প, দক্ষ চিত্রনাট্য, আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষিত জনবল, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং সবচেয়ে বড় কথা-সৃজনশীল স্বাধীনতা।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের শতবর্ষের ইতিহাস তাই কেবল কিছু সিনেমার তালিকা নয়; এটি একটি জাতির সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ইতিহাস। এই ইতিহাসে যেমন রয়েছে সংগ্রাম, তেমনি রয়েছে গৌরব; যেমন রয়েছে ব্যর্থতা, তেমনি রয়েছে বিশ্বজয়ের গল্প। আলো-ছায়ার এই দীর্ঘ অভিযাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয়-চলচ্চিত্র শুধু পর্দায় দেখা একটি গল্প নয়, এটি একটি জাতির স্মৃতি, সংস্কৃতি, সময় এবং স্বপ্নের সবচেয়ে শক্তিশালী দৃশ্যভাষা।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র এখন নতুন এক সন্ধিক্ষণে। শতবর্ষের ঐতিহ্যকে ধারণ করে যদি নতুন প্রজন্মের নির্মাতারা সাহসী গল্প, আন্তর্জাতিক মানের নির্মাণশৈলী এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সামনে নিয়ে এগিয়ে যেতে পারেন, তবে আগামী শতক হবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বিশ্বজয়ের শতক। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়-যে শিল্প নিজের শিকড়কে ধারণ করে, তাকে থামিয়ে রাখা যায় না।

লেখক : সাংবাদিক ও সংগঠক।

কালের সমাজ/কে.পি

Link copied!