ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত ভেনেজুয়েলায় দিন যত গড়াচ্ছে, ততই প্রকট হয়ে উঠছে মানবিক সংকট। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষের আর্তনাদ, স্বজন হারানোর বেদনা এবং উদ্ধারকাজের ধীরগতিতে গোটা দেশ শোক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপ থেকে ৯২০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের ত্রাণবিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার বলেছেন, উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা এখনও নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে, দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজও জানিয়েছেন, উদ্ধারকাজ যত এগোচ্ছে, মৃত ও আহতের সংখ্যা ততই বাড়ছে। রাজধানী কারাকাসের উত্তরাঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু ভবন ধসে পড়ায় হাজারো মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ধ্বংসস্তূপের নিচে অন্তত ২০০ জন জীবিত অবস্থায় আটকা রয়েছেন। কিন্তু ভারী উদ্ধার সরঞ্জাম ও আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে উদ্ধারকাজ প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না। এতে স্বজনদের উদ্বেগ, হতাশা ও ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। অনেক পরিবার দিনের পর দিন ধ্বংসস্তূপের পাশে অপেক্ষা করছেন, প্রিয়জনের সন্ধানের আশায়।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এগিয়ে এসেছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সংস্থা উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। স্পেন, এল সালভাদর, সুইজারল্যান্ড, কলম্বিয়া, মেক্সিকোসহ মোট ১৭টি দেশের বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে কাজ করছে। ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও কারাকাসে পৌঁছেছেন।
এদিকে দুর্যোগের এই সময়ে ভেনেজুয়েলার ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিও জোরালো হয়েছে। দেশটির সরকার ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের দাবি, নিষেধাজ্ঞার কারণে উদ্ধার সরঞ্জাম, ওষুধ, চিকিৎসা সামগ্রী এবং জরুরি মানবিক সহায়তা দ্রুত আমদানি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের মতে, এই সংকটময় সময়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক বিবেচনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
ভূতাত্ত্বিকদের মতে, ক্যারিবীয় ও দক্ষিণ আমেরিকান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় ভেনেজুয়েলার উত্তর উপকূল দীর্ঘদিন ধরেই ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। সাম্প্রতিক শক্তিশালী ভূমিকম্প দেশটির দুর্বল অবকাঠামোকে আরও ভেঙে দিয়েছে এবং লাখো মানুষের জীবন-জীবিকাকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তাৎক্ষণিক উদ্ধার তৎপরতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা নিশ্চিত না হলে ভেনেজুয়েলার এই বিপর্যয় আরও গভীর মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে। এখন দেশটির সবচেয়ে বড় প্রয়োজন দ্রুত উদ্ধার অভিযান, পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা, নিরাপদ আশ্রয় এবং আন্তর্জাতিক সহমর্মিতা।
কালের সমাজ/ এএইচ বি

