২৩ জুন ২০২৬। রোজ গার্ডেনের সেই ঐতিহাসিক স্থানে ১৯৪৯ সালের যে বীজ বপন হয়েছিল, আজ তার ৭৭তম বার্ষিকী। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-যে দলের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অমর স্বপ্ন। কিন্তু আজ, এই ৭৭ বছর পর, দলটি নেতৃত্বশূন্য, নিষিদ্ধ এবং তার অসংখ্য নেতা-কর্মী কারাগারে কিংবা দেশ-বিদেশে নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন। এই বার্ষিকী শুধু উদযাপনের নয়, গভীর চিন্তা ও আত্মপর্যালোচনারও।
১৯৪৯ সালের ২৩ জুন, পূর্ববাংলার রাজনৈতিক আকাশে যখন অন্ধকার ঘনিয়ে আসছিল, তখন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শামসুল হক, ইয়ার মোহাম্মদ খান ও শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। পরে ধর্মনিরপেক্ষতার পথে এগিয়ে নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ, আর স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। এই দলের হাত ধরেই বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬-এর ছয় দফা-যা পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে জোরালো করে, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বোপরি ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগ ছিল অগ্রণী ভূমিকায়। বঙ্গবন্ধুর অসম সাহসিকতা ও নেতৃত্বে লাখো শহীদের রক্তে স্বাধীনতা অর্জিত হয়। দল ও দেশ যেন একই সূত্রে গাঁথা হয়ে যায়।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকার দেশ গড়ার কাজে হাত দেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ড সবকিছু ছিন্নভিন্ন করে দেয়। বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হন, কিন্তু অলৌকিকভাবে বেঁচে যান তার দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। সেই থেকে শুরু হয় দীর্ঘ নির্বাসন ও সংগ্রাম। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা দলের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং দেশে ফিরে আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠিত করেন। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন-এসবের মধ্য দিয়ে দল এগিয়ে যায়।
১৯৯৬ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় আসেন শেখ হাসিনা। গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, চট্টগ্রাম পার্বত্য চুক্তি, খাদ্য নিরাপত্তা-এসব অর্জন স্মরণীয়। ২০০৯ সাল থেকে টানা ১৫ বছরের শাসনকালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, পায়রা বন্দর, ডিজিটাল বাংলাদেশ-একের পর এক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। দারিদ্র্য হ্রাস, মধ্যবিত্ত সম্প্রসারণ, নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি-এসব ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়। বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের এই উন্নয়ন মডেলকে প্রশংসা করে।
কিন্তু এই অর্জনের পাশাপাশি ব্যর্থতা ও সমালোচনাও কম নয়। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা, বিরোধী দল দমন, নির্বাচনী বিতর্ক, দুর্নীতির অভিযোগ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় সংকোচন-এসব অভিযোগ শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে উঠেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জন অভ্যুত্থানে সহিংসতা, ব্যাপক প্রাণহানি এবং শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও ভারতে আশ্রয় গ্রহণ-এ ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। ২০২৫ সালের মে মাসে এই নিষেধাজ্ঞা আরও আনুষ্ঠানিক রূপ পায় এবং নির্বাচন কমিশন দলের নিবন্ধন স্থগিত করে। বর্তমানে দলের হাজার হাজার নেতা-কর্মী কারাগারে, অনেকে দেশের বাইরে নির্বাসিত। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারও এই নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছে। স্বাধীনতার পর থেকেই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দেশি-বিদেশি চক্রান্তের অভিযোগ উঠে আসছে-১৯৭৫-এর হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে বারবার নেতৃত্বশূন্য করার চেষ্টা।
তবু ইতিহাস বলে, আওয়ামী লীগ বারবার উঠে দাঁড়িয়েছে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক এই দলের মূল শক্তি। আজ যখন দল নিষিদ্ধ, নেতারা অনুপস্থিত, তখন প্রশ্ন উঠছে-আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কী? অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই সংকট সাময়িক। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরে এলে, আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে দল আবার সক্রিয় হতে পারে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন অভ্যন্তরীণ সংস্কার, নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব তৈরি এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা।
৭৭ বছরের পথচলায় আওয়ামী লীগের প্রাপ্তি অপরিসীম। স্বাধীনতা অর্জন, দেশ গঠন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন-এসবের পাশাপাশি ব্যর্থতাও শিক্ষা। আজ যখন দলের অনেক কর্মী নির্যাতিত, তখনও জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধুর স্লোগানে তাদের বিশ্বাস অটুট। ভবিষ্যতে এই দল যদি গণতন্ত্র, সেক্যুলারিজম ও উন্নয়নের সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করে, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার অবস্থান আবার সুদৃঢ় হবে।
এই ৭৭তম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানাই সকল শহীদ ও সংগ্রামীদের প্রতি। আওয়ামী লীগের ইতিহাস শুধু একটি দলের নয়, বাংলাদেশেরই ইতিহাস। সংকট কাটিয়ে উঠে নতুন করে দেশ গড়ার শপথ নেওয়ার সময় এসেছে। জনগণের পাশে থেকে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সমুন্নত রেখে এগিয়ে যাওয়াই হোক এই দলের নতুন সংকল্প। বাংলাদেশের সামনে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ, কিন্তু ইতিহাসের এই ধারা কখনো থেমে থাকবে না।
কালের সমাজ/এসআর

