ঢাকা শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬, ১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩

হাম, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ত্রিমুখী আক্রমণে জনস্বাস্থ্য কতটা নিরাপদ?

মোহাম্মদ আলী সুমন | জুলাই ২৯, ২০২৬, ০৪:৩৪ পিএম হাম, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ত্রিমুখী আক্রমণে জনস্বাস্থ্য কতটা নিরাপদ?

একটি রাষ্ট্রের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সফলতা পরিমাপ করা হয় হাসপাতালের শয্যা দিয়ে নয়, প্রতিরোধের সক্ষমতা দিয়ে। যখন একটি শিশুর মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হয় না, তখন সেটি কেবল একটি পরিবারের শোক নয়; রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থারও একটি নীরব ব্যর্থতার দলিল। 

বর্তমানে বাংলাদেশ ঠিক এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, যেখানে একই সময়ে হাম, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া-তিনটি সংক্রামক রোগ জনস্বাস্থ্যকে বহুমাত্রিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে, শিশু মৃত্যুর সংখ্যা দীর্ঘ হচ্ছে, আর নগর ও গ্রাম-দুই জায়গাতেই সংক্রমণের বিস্তার নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮২৮ জনে। এর মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৯৮ শিশু এবং উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে আরও ৭৩০ শিশু। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ১,১০৫ জন। এখন পর্যন্ত দেশে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ২৪ হাজার ৭৪৫ জন এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা ১৫ হাজার ৫৫৫ জন। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ৬৫৪ জন, যাদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ৪৬৭ জন।

সংখ্যাগুলো শুধু মাত্র পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি শূন্য হয়ে যাওয়া কোল, একটি অসমাপ্ত ভবিষ্যৎ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যে হামকে বহু বছর ধরে টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছিল, সেই রোগই আবার ভয়াবহ রূপে ফিরে এসেছে। এটি স্পষ্ট করে যে কোথাও না কোথাও টিকাদান ব্যবস্থায় ঘাটতি, নজরদারির দুর্বলতা, সচেতনতার অভাব এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের সংকট রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বহুবার সতর্ক করেছে, হাম বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগগুলোর একটি। একটি আক্রান্ত ব্যক্তি অনাক্রম্য ১০ থেকে ১৮ জন পর্যন্ত মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে। সংস্থাটির মতে, কোনো দেশে হাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে সময়মতো দুই ডোজ টিকার আওতায় আনতে হবে। টিকাদানের হার কমে গেলে সংক্রমণ দ্রুত মহামারির রূপ নিতে পারে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি সেই সতর্কবার্তার বাস্তব প্রতিফলন বলেই মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

হামের এই সংকট যখন তীব্র, তখন বর্ষার পানির সঙ্গে সমানতালে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৬৪৪ জনে। রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ৫৯টি ওয়ার্ড ইতোমধ্যে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে, ডেঙ্গু আর মৌসুমি রোগ নয়; এটি এখন নগর পরিকল্পনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া একটি স্থায়ী জনস্বাস্থ্য সংকট।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, জ্বরকে সাধারণ ভাইরাস জ্বর ভেবে অবহেলা করা সবচেয়ে বড় ভুল। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হাসান হাফিজুর রহমানের মতে, জ্বর হলে শুধু প্যারাসিটামল গ্রহণ করা উচিত। মাথাব্যথা, গিঁটে ব্যথা, শরীরে র‍্যাশ বা অতিরিক্ত দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন কিংবা অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত তরল, ডাবের পানি, ওরাল স্যালাইন এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী মনে করেন, বর্তমানে করোনা, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ডায়রিয়াসহ একাধিক ভাইরাসজনিত রোগ একই সময়ে ছড়িয়ে পড়ায় মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে। ফলে অনেক রোগী দেরিতে হাসপাতালে আসছেন। তাঁর মতে, আতঙ্ক নয়, দ্রুত পরীক্ষা এবং সঠিক রোগ নির্ণয়ই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন আরও কঠোর ভাষায় বলেছেন, প্রতি বছর ডেঙ্গুর সময় সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয় না। শুধুমাত্র কীটনাশক ছিটিয়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন কার্যকর নগর ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত জনবল, বৈজ্ঞানিক লার্ভা নিয়ন্ত্রণ এবং সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।

আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী সতর্ক করেছেন, বর্তমানে ডেন-৩ (DENV-3) সেরোটাইপের বিস্তার বাড়ছে। এই ধরনটি রোগীর মধ্যে দ্রুত ডেঙ্গু শক সিনড্রোম সৃষ্টি করতে পারে। অর্থাৎ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে উঠতে পারে। তাই জ্বরকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।

বিশিষ্ট শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, এডিস মশা পরিষ্কার জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে। ফুলের টব, ছাদের কোণা, এসির ট্রে, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র কিংবা পানির ড্রাম-এসবই এডিসের নিরাপদ প্রজননক্ষেত্র। সূর্যোদয়ের পরের দুই ঘণ্টা এবং সূর্যাস্তের আগের কয়েক ঘণ্টা এডিস সবচেয়ে সক্রিয় থাকে। ফলে ব্যক্তিগত সুরক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ডেঙ্গুর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়াও একই এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। যদিও চিকুনগুনিয়ায় মৃত্যুহার তুলনামূলক কম, তবে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র গিঁটের ব্যথা, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে একই মশা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দুটি রোগ প্রতিরোধ সম্ভব হলেও বাস্তবে সেই সমন্বিত উদ্যোগ এখনও দৃশ্যমান নয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বহুদিন ধরেই বলে আসছে, চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধে বিনিয়োগ সবচেয়ে কার্যকর। হামের ক্ষেত্রে শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করা এবং ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়ার ক্ষেত্রে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত নির্মাণ, প্লাস্টিক বর্জ্যের বিস্তার এবং জনঘনত্ব বৃদ্ধির কারণে ভবিষ্যতে এসব রোগের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।

এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া বিশেষ বার্তায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে সর্বজনীন পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি বলেছেন, সচেতনতা থাকলে ডেঙ্গু কিংবা চিকুনগুনিয়া থেকে নিজেদের রক্ষা করা সম্ভব। তিনি আহ্বান জানিয়েছেন, কোথাও তিন দিনের বেশি পরিষ্কার পানি জমতে দেওয়া যাবে না; ফুলের টব, ড্রাম, টায়ার, ছাদ ও পানির ট্যাংক নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। প্রতি সপ্তাহে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা এবং স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও জনগণের সমন্বিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপরও তিনি জোর দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, “প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম”-এটাই সরকারের জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির মূল দর্শন।

তবে জনমনে প্রশ্ন থেকে যায়-শুধু সচেতনতামূলক প্রচার কি যথেষ্ট? যখন একের পর এক শিশু মারা যাচ্ছে, হাসপাতালের শয্যা পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে, তখন প্রয়োজন আরও কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ। প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে জরুরি রোগ নজরদারি, শতভাগ টিকাদান নিশ্চিতকরণ, দ্রুত ল্যাব পরীক্ষার সুযোগ, পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম, স্থানীয় সরকারকে জবাবদিহির আওতায় এনে নিয়মিত এডিসবিরোধী অভিযান এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এখন জরুরী।

গণমাধ্যমেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। আতঙ্ক নয়, তথ্যভিত্তিক সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া, গুজব প্রতিরোধ, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যবিধি প্রচার এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো অনুসন্ধান করে তুলে ধরা এখন সাংবাদিকতার অন্যতম দায়িত্ব হওয়া উচিত।

এজন্য রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে, প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুমৃত্যু কখনোই স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে না। প্রতিটি মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়-স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ ব্যয় নয়, ভবিষ্যৎ রক্ষার সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। হাম, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার বিরুদ্ধে এই লড়াই শুধু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নয়; এটি রাষ্ট্র, স্থানীয় সরকার, চিকিৎসক, গণমাধ্যম এবং প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব। কারণ একটি জাতি তখনই নিরাপদ, যখন তার শিশুরা নিরাপদ, যখন একটি সাধারণ জ্বর মৃত্যুর আশঙ্কায় পরিণত না হয়, এবং যখন প্রতিরোধই হয়ে ওঠে জাতীয় অঙ্গীকার।

লেখক : সাংবাদিক ও সংগঠক।

মুক্তমঞ্চ বিভাগের আরো খবর

Link copied!