গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে যখন মানুষ একটু স্বস্তির জন্য বিদ্যুতের অপেক্ষায় থাকে, তখন ঘরে নেমে আসা দীর্ঘ অন্ধকার কেবল আলোহীনতার নয়-এটি রাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার গভীর দুর্বলতার নির্মম প্রতিচ্ছবি। জাতীয় গ্রিডে লোডশেডিং তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাওয়া এবং ১০ আগস্ট সন্ধ্যায় তা প্রায় তিন হাজার সাতশ পঞ্চান্ন মেগাওয়াটে পৌঁছানো পরিস্থিতির গুরুতরতা স্পষ্ট করে দিয়েছে। ওই সময় চাহিদা ছিল প্রায় ষোলো হাজার দুইশ বাষট্টি মেগাওয়াট, অথচ সরবরাহ নেমে আসে প্রায় বারো হাজার পাঁচশ মেগাওয়াটে। গ্রামীণ এলাকায় দিনে ছয় থেকে বারো ঘণ্টা, কোথাও কোথাও চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রচণ্ড গরমে শিশু-বৃদ্ধ-অসুস্থ মানুষের কষ্ট বেড়েছে, কৃষকের সেচ ব্যাহত হচ্ছে, ক্ষুদ্র ব্যবসা ক্ষতির মুখে পড়ছে, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা থমকে যাচ্ছে। এমনকি বিদ্যুৎ অফিস ও উপকেন্দ্রে ক্ষুব্ধ মানুষের হামলা-ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।এই বাস্তবতা কেবল সাময়িক ঘাটতি নয়-এটি বিদ্যুৎ উৎপাদন, গ্যাস সরবরাহ, এলএনজি আমদানি এবং সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনার সংকটের স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ গ্যাসনির্ভর। অথচ বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক প্রায় আড়াই হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন থাকলেও সরবরাহ সেই চাহিদার ধারেকাছেও নেই। এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় দশ হাজার মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না; উৎপাদন নেমে আসছে প্রায় চার হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। কয়লার সংকট, আদানি পাওয়ার থেকে প্রত্যাশিত মাত্রায় বিদ্যুৎ না আসা, পায়রাসহ কয়েকটি কেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যা এবং তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালানোর উচ্চ ব্যয়-সব মিলিয়ে ঘাটতি আরও তীব্র হয়েছে। স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় উনত্রিশ হাজার মেগাওয়াট হলেও প্রয়োজনের মুহূর্তে উৎপাদন বারো-তেরো হাজার মেগাওয়াটের আশপাশে আটকে থাকার অর্থ একটাই: কেন্দ্র নির্মাণ করলেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি, সঞ্চালন ব্যবস্থা এবং আর্থিক সক্ষমতার সমন্বয়।
এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু স্পষ্ট করেছেন-মেরামতের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া সরকারের সামনে আপাতত কোনো বিকল্প নেই। এফএসআরইউ ছাড়া গ্যাস নামানোর সুযোগ নেই। তিনি বলেছেন, এই ক্রাইসিসের সময় আমার কিছু করার নাই। এখন শুধু আমাকে দিন গোনা ছাড়া আর ইঞ্জিনিয়াররা যে কাজ করছে, এটা করা ছাড়া আমার কিছু নাই। মেরামতের দায়িত্ব মূলত মালিকানাধীন মার্কিন কোম্পানির। বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেশে আসার চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে সাইটে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে এবং জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দিনরাত কাজ করছেন। এফএসআরইউ অচল থাকলেও এলএনজি কেনা বন্ধ নেই-আগের দিনই চারটি কার্গো কেনা হয়েছে। টার্মিনাল সচল হলে এগুলো আনলোড করে সংকট অনেকাংশে কমানো যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কম লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার ব্যবস্থাপনাও চলছে।
তবে মন্ত্রীর এই স্বীকারোক্তি ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থাপনা সংকটের মূল কারণকে ঢেকে রাখতে পারে না। গত সতেরো বছরে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান না করে শুধু আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও যথেষ্ট গড়ে তোলা হয়নি। দুটি এফএসআরইউয়ের পরিবর্তে চারটি স্থাপন করা হলে আজকের মতো পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না-এ কথা মন্ত্রী নিজেই বলেছেন। বর্তমান সরকার বাপেক্সকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে, দ্রুত কূপ খননের জন্য আরও দুটি রিগ কেনার নির্দেশ দিয়েছে। ২০২৯ সালের মধ্যে আরও তিনটি এফএসআরইউ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে; একটির কার্যাদেশ ইতিমধ্যে দেওয়া হয়েছে, বাকি দুটিরও আগামী দুই মাসের মধ্যে দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে সব টার্মিনাল কেন্দ্রীভূত থাকায় খুলনা অঞ্চলে (পায়রা, মোংলা, হিরণ পয়েন্ট) নতুন টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চলছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিনিয়োগকারী দলও আগ্রহ প্রকাশ করেছে। চট্টগ্রাম থেকে বাখরাবাদ পর্যন্ত পাইপলাইন ঘাটতি দূর করতে নতুন লাইন নির্মাণ এবং ভোলা থেকে গ্যাস আনার বিষয়ে মালয়েশিয়ার সঙ্গে আলোচনা চলছে।
তবুও সংকট কেবল অবকাঠামোর নয়। শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদন ত্রিশ থেকে চল্লিশ শতাংশ কমেছে। ডাইং, ফিনিশিং, নিটিং, প্লাস্টিক ও সিরামিক শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে শ্রমিকের আয়, রপ্তানি আয় এবং জাতীয় অর্থনীতিতে। সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন, বিকল্প জ্বালানির বাড়তি ব্যয়-সব মিলিয়ে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়াতে পারে। সরকার দোকানপাটের সময় সীমিত করা, সাইনবোর্ডের আলো বন্ধ রাখাসহ কিছু তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়েছে। এগুলো জরুরি, কিন্তু সংকটের চিকিৎসা নয়-আপাতত ব্যথা কমানোর ব্যবস্থা মাত্র।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ছাড়া এই চক্র থেকে বেরোনো সম্ভব নয়। প্রথমত, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে গতি বাড়াতে হবে; নতুন ক্ষেত্র অনুসন্ধান, পুরোনো ক্ষেত্রের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো আধুনিকায়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, এলএনজি আমদানিতে একক উৎস বা সীমিত সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উৎস ও চুক্তি ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনতে হবে। তৃতীয়ত, সৌর, বায়ু ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়াতে হবে-ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ও শিল্পাঞ্চলে সৌর প্রকল্পের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে। চতুর্থত, বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা জরুরি; কোন কেন্দ্র কত ব্যয়ে উৎপাদন করছে এবং কোন চুক্তি রাষ্ট্রের জন্য যৌক্তিক-এসব প্রশ্নের উত্তর জনগণের জানা দরকার। পঞ্চমত, উৎপাদনের পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, জ্বালানি নীতিকে রাজনৈতিক মেয়াদের বাইরে নিয়ে জাতীয় পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা কোনো দলের একক সম্পদ নয়-এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার প্রশ্ন।
আজকের লোডশেডিং আগামী দিনের জন্য একটি সতর্কবার্তা। অন্ধকার ঘরে বসে থাকা মানুষ শুধু বিদ্যুতের অপেক্ষা করছে না-সে একটি কার্যকর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার অপেক্ষা করছে। শিল্পমালিক নির্ভরযোগ্য উৎপাদন পরিবেশ চাইছেন, কৃষক নিশ্চিত সেচব্যবস্থা চাইছেন, ব্যবসায়ী স্থিতিশীল অর্থনীতি চাইছেন। এই সংকটকে সাময়িক বলে পাশ কাটানোর সময় শেষ। উত্তর কেবল আরও কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বা টার্মিনাল নির্মাণে নেই। উত্তর রয়েছে জ্বালানি নিরাপত্তায়, দক্ষ ব্যবস্থাপনায়, স্বচ্ছতায়, বহুমুখী জ্বালানি ব্যবস্থায় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায়।
মানুষ এখন আর আশ্বাসের আলো চায় না-চায় ঘরের আলো। বিদ্যুৎহীন একটি রাত হয়তো সহ্য করা যায়, কিন্তু বারবার ফিরে আসা অন্ধকার কোনো উন্নয়নশীল দেশের ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি হতে পারে না। এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে-বাংলাদেশ কি প্রতি গ্রীষ্মে লোডশেডিংয়ের সঙ্গে আপস করবে, নাকি একটি নিরাপদ, স্থিতিশীল ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে সত্যিকার অর্থে এগিয়ে যাবে? এই সিদ্ধান্তের সময় এখনই।
লেখক : সাংবাদিক ও সংগঠক।
কালের সমাজ/কে.পি

