ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

“প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘে ঐতিহাসিক উপস্থিতি”

তারিক আফজাল | সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬, ১০:৩০ এএম “প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘে ঐতিহাসিক উপস্থিতি”

‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এই মন্ত্রে বিশ্বাসী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের মঞ্চে বক্তব্য রাখলেন।

প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়েছিলেন। তাঁর সহধর্মিণী, আপসহীন নেত্রী ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও ১৯৯৩ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন। এবার সেই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য রাখলেন।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তারেক রহমান বলেন, “এখানে দাঁড়িয়ে আমার কিছুটা নস্টালজিক লাগছে।” তিনি তাঁর বাবা-মায়ের কথা স্মরণ করে আরও বলেন, “একই চেতনা ধারণ করে আজ আমি এখানে দাঁড়িয়েছি আমার দেশ ও দেশের জনগণের স্বার্থের কথা বলার জন্য এবং একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা নিয়ে।”

সম্প্রতি এশিয়া টাইমসসহ বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর জাতিসংঘে বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে। লেখকের দৃষ্টিতে, একই পরিবারের পিতা, মাতা ও পুত্রের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে বক্তব্য দেওয়ার এই ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে বিশ্বশান্তি, মানবতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এসব বিষয়কে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন পরিকল্পনার পাশাপাশি বিশ্বশান্তি, ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার এবং জাতিসংঘের মাধ্যমে শান্তি, সমৃদ্ধি ও ঐক্য প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বক্তব্য দেন।

শিশু, নারী, যুবসমাজ এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সরকারের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ই-হেলথ কার্ড চালুর পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যতে ইউনিভার্সাল কার্ড চালুর উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়।

স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও পরিবেশসহ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের পরিকল্পনার একটি রূপরেখাও তিনি তুলে ধরেন। পাশাপাশি গণতন্ত্রকে সুসংহত করা, মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা এবং কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

লেখকের মতে, প্রধানমন্ত্রীর এ উদ্যোগ তাঁর প্রয়াত পিতা ও মাতার প্রতি শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ এবং তাঁদের অসমাপ্ত কাজ এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকারের প্রতিফলন।

প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফরে বহুপাক্ষিক, দ্বিপাক্ষিক ও উচ্চপর্যায়ের বেশ কয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে জলবায়ু, পারস্পরিক সহযোগিতা ও অংশীদারত্বসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিব ও অন্যান্য দেশের প্রতি আহ্বান জানান।

সফরকালে আগামী বছরগুলোতে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮০ হাজার নারী স্বাস্থ্যকর্মী থাকবেন। পাশাপাশি মিডওয়াইফারি বা ধাত্রীসেবা খাতে ২৫ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনার কথাও তিনি তুলে ধরেছেন।

সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ওয়াল স্ট্রিটের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশ “ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত” এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশ করতে আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে প্রস্তুত।

ম্যানহাটনে জেপিমরগ্যান চেজের সদর দপ্তরে প্রতিষ্ঠানটির আয়োজিত ব্যবসায়ী নেতা ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে এক প্রাতরাশ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের বার্তা খুবই সহজ: বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত।”

তিনি বলেন, “আমরা ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানাই। আমরা চাই বাংলাদেশ এমন একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত হোক, যেখান থেকে আপনারা আরও বৃহৎ আঞ্চলিক বাজারে সেবা দিতে পারবেন।”

বিনিয়োগকারীদের জন্য “আস্থা, পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং বিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ” নিশ্চিত করতে তাঁর সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

নিজের কর্মজীবনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, “রাজনীতিতে আসার আগে আমি ব্যবসা দিয়ে আমার কর্মজীবন শুরু করেছিলাম। সেখান থেকে আমি একটি সহজ শিক্ষা পেয়েছি: বিনিয়োগের জন্য আস্থা, পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং বিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৮ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার বাংলাদেশে রয়েছে তরুণ ও কর্মঠ জনগোষ্ঠী, ক্রমবর্ধমান বাজার এবং কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান। বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন ও তৈরি পোশাকের কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশের পরিচিতির পাশাপাশি জ্বালানি, অবকাঠামো, লজিস্টিকস, প্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা, জলবায়ু অর্থায়ন, উৎপাদন, কৃষি ও স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং বাংলাদেশকে বিশ্বব্যাপী সংযুক্ত উৎপাদন, বিনিয়োগ ও সেবা খাতের একটি কেন্দ্রে পরিণত করা।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা জোরদার, বিধিবিধান সহজ করা, কর ও ভ্যাট প্রশাসনের উন্নতি, মুনাফা সহজে দেশে ফেরত নেওয়ার সুযোগ এবং উন্নত অবকাঠামোর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশকে আরও সহজ ও পূর্বানুমানযোগ্য করে তুলতে সরকার কাজ করছে।

বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রচেষ্টার কথাও তুলে ধরেন তিনি। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে নতুন অংশীদারত্বের উদ্যোগ নিয়েছে এবং চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে।

তিনি বলেন, “বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।”

বাংলাদেশের প্রথম সার্বভৌম বন্ড ইস্যুতে জেপিমরগ্যানের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন রেফারেন্স তৈরি হয়েছে এবং বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে সহায়তা করেছে।

তারেক রহমান বলেন, বিনিয়োগকারীরা জানতে চান—নিয়মকানুন কতটা পূর্বানুমানযোগ্য, বিনিয়োগ কতটা সুরক্ষিত, মূলধন কতটা দক্ষতার সঙ্গে স্থানান্তর করা যায় এবং মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়া যায় কি না। তিনি এসবকে “যৌক্তিক প্রশ্ন” হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, “নীতির মাধ্যমে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, তার বাস্তবায়নের মাধ্যমে আস্থা তৈরি করাই আমাদের দায়িত্ব।”

বাংলাদেশ স্বল্পমেয়াদি লেনদেনের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের সন্ধান করছে বলেও জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের সরকারের লক্ষ্য অত্যন্ত পরিষ্কার। আরও বিনিয়োগ। আরও বাণিজ্য। আরও কর্মসংস্থান। আরও প্রযুক্তি। এবং বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব।”

তিনি আরও বলেন, “আমি আপনাদের আস্থার সঙ্গে বিনিয়োগ করার এবং দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশে ব্যবসা গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা আপনাদের সঙ্গে কাজ করতে, আপনাদের কথা শুনতে এবং যেখানে সম্ভব বাধা দূর করতে প্রস্তুত। আশা করি, খুব শিগগিরই আপনাদের অনেককে বাংলাদেশে দেখতে পাব।”

প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে জাতিসংঘ সফর বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। লেখকের প্রত্যাশা, এ সফরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের নতুন সুযোগ তৈরি হবে এবং এর সুফল দেশের মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।

আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের মানুষ রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে দেশের উন্নয়ন ও কল্যাণের স্বার্থে নতুন নেতৃত্বের ইতিবাচক উদ্যোগগুলোকে সহযোগিতা করবেন। দেশের উন্নয়নকে অর্থবহ ও জনকল্যাণমুখী করতে সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

জেগে উঠুক দেশ, আর ধ্বনিত হোক—“সবার আগে বাংলাদেশ।”

 

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকার

Link copied!