ঢাকা শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬, ৬ ভাদ্র ১৪৩৩

রাজপথ থেকে বঙ্গভবন: মির্জা ফখরুলের নীরব দৃঢ়তার যাত্রা

মোহাম্মদ আলী সুমন | আগস্ট ২১, ২০২৬, ০৫:০১ পিএম রাজপথ থেকে বঙ্গভবন: মির্জা ফখরুলের নীরব দৃঢ়তার যাত্রা

ঠাকুরগাঁওয়ের পৌর চেয়ারম্যান থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় মঞ্চ, সেখান থেকে মন্ত্রীসভা এবং অবশেষে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ-মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই দীর্ঘ পথচলা শুধুমাত্র একজন রাজনীতিকের ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। এটি গোটা বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যেখানে সংগ্রাম, ধৈর্য, সংযম ও আদর্শিক স্থিরতা একসূত্রে গাঁথা। 

বৃহস্পতিবার সংসদে অনুষ্ঠিত ভোটে তিনি দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় শপথ গ্রহণ শেষে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গভবনের বাসিন্দা হয়েছেন। পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন যে ব্যক্তি, তার জীবনপথ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়-রাজনীতি শুধু ক্ষমতার খেলা নয়, এটি ত্যাগ, ধৈর্য ও নীরব দৃঢ়তারও পরীক্ষা।

১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি তৎকালীন দিনাজপুরের (বর্তমান ঠাকুরগাঁও) এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম মির্জা ফখরুলের। পিতা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী, সমাজসেবক ও রাজনীতিবিদ। পরিবার থেকেই তিনি ন্যায়বোধ, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমের বীজ পেয়েছিলেন। ঢাকা কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবনেই নেতৃত্বের গুণাবলি প্রকাশ পায়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এস. এম. হল শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে তিনি সংগঠনের নেতৃত্বে থেকে রাজনীতির কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। তার বক্তব্য ছিল যুক্তিনির্ভর, সংযত ও আবেগঘন-যা পরবর্তী জীবনেও তার পরিচয়ের অংশ হয়ে থাকে।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি সক্রিয়ভাবে স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেন। সংগঠক ও যোদ্ধা-উভয় ভূমিকাতেই অবদান রাখেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়ে ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে বিভিন্ন সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন এবং পরিদর্শন ও আয়-ব্যয় পরীক্ষণ অধিদপ্তরেও দায়িত্ব পালন করেন। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস. এ. বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও কাজ করেন। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি আবার শিক্ষকতায় ফিরে যান।
১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) তে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে পরাজিত হলেও ২০০১ সালে বিজয়ী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তৎকালীন খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় প্রথমে কৃষি এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালে পরাজয় এলেও দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন। ২০১৮ সালে বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত হলেও শপথ গ্রহণ না করায় আসনটি শূন্য হয়। সাম্প্রতিক ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

বিএনপির মহাসচিব হিসেবে তার নেতৃত্ব আরও বেশি প্রশংসিত। ২০০৯ সালে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব, ২০১১ সালে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচিত হন। দলের কঠিন সময়ে গ্রেপ্তার, মামলা, আন্দোলন ও সাংগঠনিক সংকটের মধ্য দিয়েও তিনি সংযত কণ্ঠে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার চেষ্টা করেছেন। অনেকেই তাকে “ভদ্র রাজনীতির প্রতীক” বলে অভিহিত করেন। তার ভাষা আক্রমণাত্মক নয়, কিন্তু অবস্থান দৃঢ়। সংসদীয় গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের পক্ষে তিনি সর্বদা সোচ্চার থেকেছেন। সহিংসতার পরিবর্তে রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দেওয়াই তার কৌশলগত বৈশিষ্ট্য।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের শাসনামলে নির্বাচিত ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গত ২৪ জুলাই মেয়াদের দেড় বছর বাকি থাকতেই পদত্যাগ করেন। চলতি মাসের শুরুতে তফসিল ঘোষণার পর বিএনপি তাদের মহাসচিব মির্জা ফখরুলকে প্রার্থী করে। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান অলি আহমদ, যিনি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী, তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। সংসদে ভোটে মির্জা ফখরুল ২৫৫ ভোট পান, অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট।

এখন তার সামনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ভূমিকার। বিএনপির মহাসচিব হিসেবে তিনি ছিলেন দলীয় কণ্ঠস্বর। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাকে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। বামপন্থী ছাত্রনেতা থেকে শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, স্থানীয় নেতা, মন্ত্রী, দীর্ঘ বিরোধী আন্দোলনের মুখ এবং অবশেষে রাষ্ট্রপতি-এই যাত্রা সহজ ছিল না। কিন্তু তিনি প্রমাণ করেছেন যে, ধৈর্য, সহনশীলতা ও সাংগঠনিক দক্ষতাই রাজনীতির প্রকৃত শক্তি।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জীবন কেবল একজন ব্যক্তির জীবনী নয়; এটি সংগ্রাম, আদর্শ ও নীরব দৃঢ়তার দীর্ঘ পথচলার দলিল।শুক্রবার সন্ধ্যা ৭.৩০ টায় শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি নতুন অধ্যায় শুরু করছেন। দেশবাসী আশা করবে, তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবেও সেই একই সংযম, ন্যায়বোধ ও গণতান্ত্রিক চেতনা ধরে রাখবেন, যা তাকে এতদূর এনেছে। রাজপথ থেকে বঙ্গভবন-এই যাত্রা যেন রাষ্ট্রের জন্যও শুভ হয়।

লেখক : সাংবাদিক ও সংগঠক।

কালের সমাজ/কে.পি

মুক্তমঞ্চ বিভাগের আরো খবর

Link copied!