ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩
১৯৪৭ থেকে ১৯৭১

যে রক্তের বিনিময়ে বাঙালি নিজের ভাষা ও স্বাধীনতাকে ফিরে পেয়েছে

মোহাম্মদ আলী সুমন | সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬, ০১:২৯ পিএম যে রক্তের বিনিময়ে বাঙালি নিজের ভাষা ও স্বাধীনতাকে ফিরে পেয়েছে

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। সেই দিন আকাশ থেকে যেন একটা নতুন সূর্য উঠেছিল। কিন্তু পূর্ব বাংলার বাঙালির জন্য সেই সূর্য ছিল মিথ্যা আলোর মতো। অনেকেই আজও প্রশ্ন করেন-দেশভাগের আগে কি পাকিস্তান বা ভারত বাঙালিদের উপর জুলুম চালাত? নাকি জুলুমের প্রকৃত অধ্যায় শুরু হয় ১৯৪৭-এর পর? সত্যটি নিষ্ঠুরভাবে স্পষ্ট: ১৯৪৭-এর আগে পাকিস্তান বা স্বাধীন ভারত বলে কোনো রাষ্ট্রই ছিল না। তখন বাংলা ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের এক রক্তাক্ত উপনিবেশ। আর ১৯৪৭-এর পর পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অংশ হলেও বাঙালিরা আরেক ধরনের উপনিবেশিক শাসনের শিকার হয়-এবার শাসকরা ছিল নিজেদেরই ধর্মীয় ভাই বলে দাবি করা পশ্চিম পাকিস্তানিরা। এই শোষণের বিরুদ্ধেই জন্ম নেয় ভাষা আন্দোলন। আর সেই আন্দোলনের রক্তাক্ত ধারাবাহিকতাই শেষ পর্যন্ত নিয়ে যায় ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে।

ব্রিটিশ শাসনের দুই শতাব্দী বাংলার ইতিহাসে অর্থনৈতিক ধ্বংস ও মানবিক বিপর্যয়ের কাল। পলাশীর যুদ্ধের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার সম্পদ লুণ্ঠন শুরু করে। ১৭৭০ সালের মহাদুর্ভিক্ষে বাংলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ-আনুমানিক এক কোটি প্রাণ-অনাহারে মারা যায়। অথচ সেই বছরেও কোম্পানির রাজস্ব আদায় রেকর্ড পরিমাণ ছিল। মায়ের কোলে শিশুর মৃতদেহ, গ্রামের পর গ্রাম জনশূন্য-এই চিত্র ছিল বাংলার নিত্যদিনের বাস্তবতা। ১৯৪৩ সালের পঞ্চাশের মন্বন্তর আরও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। ব্রিটিশ নীতির কারণেই প্রায় ২০ থেকে ৩০ লাখ মানুষ অনাহারে মারা যায়। এই সময়ে বাঙালিরা হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে ঔপনিবেশিক শাসনের শিকার ছিল। তাদের রক্তে ভেজা মাটিতেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত গড়ে উঠেছিল।

১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগ হয়। পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অংশ হয় এই আশায় যে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল হিসেবে এখানে ন্যায়বিচার ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল এক নিষ্ঠুর প্রতারণা। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলাকে এক ধরনের অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ হিসেবেই দেখেছিল। জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও বাঙালিরা কেন্দ্রীয় ক্ষমতা, সামরিক বাহিনী ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে চরমভাবে বঞ্চিত হয়। পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তানের রপ্তানি আয়ের ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ যোগাত, অথচ উন্নয়ন বাজেটের মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বরাদ্দ পেত। বাঙালির ঘামে উৎপাদিত পাটের টাকায় পশ্চিমে গড়ে উঠত শিল্প-কারখানা, আর পূর্বে থেকে যেত শুধু দারিদ্র্য আর অবহেলা।

এই বৈষম্যের প্রথম বড় প্রতিবাদ জন্ম নেয় ভাষার প্রশ্নে। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেন, “উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।” বাংলাভাষী সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভাষাকে অস্বীকার করার এই সিদ্ধান্ত বাঙালির হৃদয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। ছাত্ররা প্রতিবাদ জানায়। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে আন্দোলন তীব্র রূপ নেয়। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের হয়। পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ অনেকে শহিদ হন। রক্তাক্ত রাজপথ সেদিন কেঁদে উঠেছিল। সেই রক্তে ভেজা মাটিতেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রথম সুসংগঠিত অভিব্যক্তি জন্ম নেয়। ভাষা আন্দোলন কেবল ভাষার অধিকারের লড়াই ছিল না; এটি ছিল সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। ২১ ফেব্রুয়ারি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত-এটি বাঙালির সেই রক্তস্নাত দিনের বৈশ্বিক স্বীকৃতি।

ভাষা আন্দোলনের পর বাঙালি চেতনা আরও সংগঠিত হয়। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। এতে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা সীমিত করে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের কথা বলা হয়। ১৯৬৮-৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান আইয়ুব খানের শাসনের ভিত নাড়িয়ে দেয়। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানায়। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হয়। ৭ মার্চ ১৯৭১-এ রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ-“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”-বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে দেয়। সেই ভাষণ আজও বাঙালির রক্তে দোলা দেয়।

২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পুলিশ লাইন, হিন্দু পাড়া-সবখানে নির্বিচার গণহত্যা চালানো হয়। রাতের অন্ধকারে গুলির শব্দ, চিৎকার, আগুনের আলো-সেই রাত বাঙালির ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়। নয় মাসের যুদ্ধে আনুমানিক ৩০ লাখ মানুষ নিহত হয়, লাখো নারী ধর্ষিত হয় এবং প্রায় এক কোটি মানুষ শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যৌথ অভিযানে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।

ইতিহাসের এই দুই পর্বের তুলনা করলে একটি স্পষ্ট পার্থক্য ধরা পড়ে। ব্রিটিশ শাসন ছিল বহিরাগত ঔপনিবেশিক শোষণ। তাতে বাঙালিরা হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে ভুক্তভোগী ছিল। পাকিস্তানি শাসন ছিল অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ-যেখানে একই ধর্মের মানুষদের মধ্যে জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বাঙালির সংগ্রাম ছিল নিজের ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক অধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম।

আজ যখন আমরা স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে ইতিহাস পর্যালোচনা করি, তখন এই সত্যটি স্বীকার করতেই হয় যে, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ বাঙালিদের জন্য কোনো মুক্তি আনেনি। এটি শুধু শাসকের পরিবর্তন এনেছিল। ভাষার জন্য রক্ত দিয়ে, স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়ে বাঙালি নিজের অস্তিত্ব ফিরে পেয়েছে। এই ইতিহাসকে ভুলে গেলে আমরা আমাদের জাতীয় চেতনার শিকড়কেই অস্বীকার করি। যে জাতি নিজের শোষণের ইতিহাসকে সঠিকভাবে না জানে, সে জাতি আবারও শোষণের শিকার হতে পারে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১-এই পথচলাই আমাদের জাতীয় চেতনার প্রকৃত শিক্ষা। এই রক্তস্নাত ইতিহাসকে স্মরণে রাখাই আমাদের কর্তব্য।

লেখক : সাংবাদিক ও সংগঠক।

মুক্তমঞ্চ বিভাগের আরো খবর

Link copied!