ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩

মানিকগঞ্জের আলোচিত আওয়ামী লীগ নেতারা এখন কে কোথায়?

কে.এম কাউছার কারাইজ, মানিকগঞ্জ | সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬, ১১:৩৪ এএম মানিকগঞ্জের আলোচিত আওয়ামী লীগ নেতারা এখন কে কোথায়?

একসময় মানিকগঞ্জের রাজনীতির অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক ছিল আওয়ামী লীগ। জেলার তিনটি সংসদীয় আসন, উপজেলা ও পৌর পর্যায়ের সংগঠন, ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটি সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দলটির একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো ছিল। জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা কয়েকজন নেতার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়েও তৈরি হয়েছিল একাধিক প্রভাবশালী বলয়। সবমিলিয়ে  জেলায় ছিলো আওয়ামী সম্রাজ্যের বিস্তার।  কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই চিত্র আমূল বদলে গেছে। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন, কেউ কেউ আত্মগোপনে চলে গেছেন। দলীয় কার্যালয়গুলোতেও নেই আগের রাজনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য।

২০২৫ সালের ১২ মে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তী সময়ে দলটির নিবন্ধনও স্থগিত করা হয়। ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারেনি। ফলে দলটির দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক কাঠামো কার্যত রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে পড়েছে। মানিকগঞ্জের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি একই। একসময় যাঁরা জেলা আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে ছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখন মামলার মুখোমুখি। কেউ কারাগারে, কেউ আত্মগোপনে। আর যাঁদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে গ্রেপ্তার বা কারাবাসের নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি, তাঁরাও প্রকাশ্য দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছেন না। তবে প্রশ্ন হচ্ছে এটাই কি তাঁদের রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায়? নাকি পরিস্থিতি বদলালে আবারও মানিকগঞ্জের রাজনীতিতে ফিরতে পারেন তাঁরা?

৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য, পুরোনো দলীয় কমিটি এবং সাম্প্রতিক আইনি ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই নয় নেতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ একরকম নয়।

জাহিদ মালেক স্বপন: একক প্রভাব থেকে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় জাহিদ মালেক স্বপন। মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপন ছিলেন জেলার আওয়ামী লীগের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নেতাদের একজন। জাতীয় রাজনীতিতে মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মানিকগঞ্জের দলীয় রাজনীতিতেও তাঁর প্রভাব ছিল ব্যাপক। জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে নির্বাচনী রাজনীতি বিভিন্ন পর্যায়ে তার প্রভাব ছিল দৃশ্যমান। এমনকি ২০২৩ সালের জেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে তাঁকে সদস্য রাখা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের পর তাঁর রাজনৈতিক বাস্তবতা পুরোপুরি পাল্টে যায়। মানিকগঞ্জে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টে বিএনপি নেত্রী আফরোজা খান রিতার গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। একই বছরের সেপ্টেম্বরে জেলা বিএনপি কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় করা মামলাতেও তাঁর নাম রয়েছে। এর বাইরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে দায়ের করা মামলাতেও তাঁকে আসামি করা হয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে তাকে আত্মগোপনে থাকার কথা বলা হয়েছে।

জাহিদ মালেকের রাজনৈতিক শক্তির মূল জায়গা ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ, দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক এবং নির্বাচনী প্রভাব। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এই তিনটি ক্ষেত্রেই বড় পরিবর্তন এসেছে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় তাঁর পক্ষে প্রকাশ্য সাংগঠনিক নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একাধিক মামলা ও দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতি।

তবে রাজনীতি যদি ভবিষ্যতে আবার আওয়ামী লীগকে সাংগঠনিকভাবে ফিরে আসার সুযোগ দেয়, তখন জাহিদ মালেকের পুরোনো নেটওয়ার্ক কতটা সক্রিয় রয়েছে সেটিই হবে বড় প্রশ্ন।

মমতাজ বেগম: জনপ্রিয়তা আছে, কিন্তু আইনি চাপ বড় বাধা মমতাজের ক্ষেত্রে। মানিকগঞ্জ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মমতাজ বেগম আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যেমন পরিচিত মুখ, তেমনি দেশজুড়ে তার রয়েছে আলাদা সাংস্কৃতিক পরিচিতি। এই দ্বৈত পরিচিতিই তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় শক্তি ও দুর্বলতা দুই দিক হতে পারে। ২০২৫ সালের মে মাসে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং বিভিন্ন মামলায় তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। মানিকগঞ্জের হত্যা ও হামলা ও ভাঙচুরের মামলাসহ বিভিন্ন মামলায় তাঁর নাম রয়েছে।

২০২৬ সালের জুনে তিনটি মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পান তিনি। তবে অন্যান্য মামলা থাকায় ওই জামিনের পরও তাৎক্ষণিকভাবে মুক্তির সুযোগ হয়নি।

মমতাজের ক্ষেত্রে অন্যদের তুলনায় একটি বাড়তি বিষয় রয়েছে সাংস্কৃতিক জনপ্রিয়তা। একজন সাবেক সংসদ সদস্য হিসেবে তার রাজনৈতিক পরিচিতি আছে, আবার সংগীতশিল্পী হিসেবে দীর্ঘদিনের জনপরিচিতিও রয়েছে। ফলে আইনি জটিলতা কাটিয়ে রাজনৈতিক মাঠে ফেরার সুযোগ তৈরি হলে তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা কিছুটা ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিপরীত দিকে রয়েছে একাধিক মামলা ও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া। অর্থাৎ মমতাজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে শুধু আওয়ামী লীগের ভবিষ্যতের ওপর নয়; তার নিজের আইনি অবস্থানের ওপরও।

নাঈমুর রহমান দুর্জয়: ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতায় আছেন নাঈমুর রহমান দূর্জয়। মানিকগঞ্জ-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নাঈমুর রহমান দুর্জয় রাজনীতির বাইরেও দেশের পরিচিত মুখ। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে তার আলাদা পরিচিতি রয়েছে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০২৫ সালের ২ জুলাই ঢাকার লালমাটিয়া থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে মানিকগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। তার বিরুদ্ধে হত্যা ও অন্যান্য মামলার পাশাপাশি দুর্নীতির মামলাও রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি মামলায় তার বিরুদ্ধে ১১ কোটি ২১ লাখ ৮১ হাজার ৭৯০ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

এটি অবশ্য আদালতে বিচারাধীন অভিযোগ; দোষী সাব্যস্ত হওয়ার বিষয় নয়। দুর্জয়ের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ভবিষ্যতের হিসাব একটু জটিল। তার ক্রিকেট পরিচিতি এখনও শক্তিশালী। কিন্তু রাজনৈতিক মাঠে তাঁর অবস্থান নির্ভর করবে আইনি জটিলতা কতটা কাটে এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতি কীভাবে পুনর্গঠিত হয় তার ওপর। এছাড়া দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে থাকা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়ায় পুরোনো নির্বাচনী প্রভাব আগের মতো থাকবে কি না সেটিও বড় প্রশ্ন।

গোলাম মহিউদ্দিন: দীর্ঘদিনের জেলা সভাপতি, সামনে নেতৃত্বের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা গোলাম মহিউদ্দিন এর সামনে। মানিকগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম মহিউদ্দিন জেলার সবচেয়ে দীর্ঘদিনের সংগঠকদের একজন। ২০১৫ সালের সম্মেলনেও তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০২২ সালের সম্মেলনেও তাঁকে একই পদে রাখা হয়। অর্থাৎ প্রায় এক দশক ধরে তিনি জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের অন্যতম কেন্দ্র ছিলেন। ২০২৩ সালের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতেও তিনি সভাপতি ছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পর তাঁর বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা হয়।

জেলা বিএনপি কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তাঁর নাম রয়েছে। মামলার এজাহারে তাঁকে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে ঘটনার পরিকল্পনা ও মদদের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। এগুলো মামলার অভিযোগ, আদালতে প্রমাণিত অপরাধ নয়।

২০২৫ সালে তিনি মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণ করে কারাগারেও যান এবং পরে জামিনে মুক্ত হন। গোলাম মহিউদ্দীনের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা। কিন্তু একই সঙ্গে বয়স, দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব, মামলা এবং আওয়ামী লীগের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থাও তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে ফিরে এলে প্রশ্ন উঠবে পুরোনো নেতৃত্বই থাকবে, নাকি নতুন প্রজন্মের নেতাদের সামনে আনা হবে? এই প্রশ্নের উত্তর মানিকগঞ্জ আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের কাঠামোও নির্ধারণ করতে পারে।

আব্দুস সালাম: সাংগঠনিক রাজনীতির পুরোনো মুখ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালামও দীর্ঘদিন ধরে মানিকগঞ্জের আওয়ামী রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র। ২০১৫ সালের সম্মেলনে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে গোলাম মহিউদ্দীন ও আব্দুস সালাম নির্বাচিত হন। ২০২২ সালের সম্মেলনেও তাঁরা একই পদে বহাল থাকেন। ২০২৩ সালের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতেও আব্দুস সালাম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। অর্থাৎ জেলার সাংগঠনিক রাজনীতিতে তাঁর অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিনের। তবে ২০২৪ সালের পর তাঁর বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা হয়েছে। জেলা বিএনপি কার্যালয়ে হামলার মামলাসহ বিভিন্ন মামলায় তাঁর নাম রয়েছে। আব্দুস সালামের শক্তি তাঁর দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ও জেলা পর্যায়ের নেটওয়ার্ক।

কিন্তু আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকায় সেই নেটওয়ার্ক বর্তমানে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কাজে ব্যবহারের সুযোগ নেই। ভবিষ্যতে দলীয় রাজনীতি স্বাভাবিক হলে তাঁর সামনে দুটি পথ থাকতে পারে পুরোনো নেতৃত্ব ধরে রাখার চেষ্টা অথবা নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয় করে নতুনভাবে সংগঠন সাজানো।

সুলতানুল আজম খান আপেল: নেতৃত্বের দৌড়ের অভিজ্ঞ সংগঠক হিসেবে পরিচিত সুলতানুল আজম খান আপেল। সুলতানুল আজম খান আপেল জেলা আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক নেতা। ২০২২ সালের সম্মেলনের সময় তিনি সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশীদের অন্যতম ছিলেন। তাঁর সঙ্গে গাজী কামরুল হুদা সেলিম, সুদেব সাহাসহ আরও কয়েকজন নেতা সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় ছিলেন।

পরে ২০২৩ সালের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে তিনি যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন। এই তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতে বোঝা যায়, আপেল শুধু পদধারী নেতা ছিলেন না। জেলা আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের আলোচনাতেও তাঁর অবস্থান ছিল। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা মামলাগুলোতেও তাঁর নাম এসেছে।

আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে পুনর্গঠিত হলে জেলা নেতৃত্বের ক্ষেত্রে পুরোনো বনাম নতুন নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে। সেই জায়গায় আপেলের মতো দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক নেতারা আবারও আলোচনায় আসতে পারেন। তবে বর্তমানে তাঁর রাজনৈতিক কার্যক্রমের সুযোগ নেই এবং সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্যও সীমিত।

রমজান আলী: মানিকগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রমজান আলী ছিলেন শহরকেন্দ্রিক আওয়ামী রাজনীতির পরিচিত মুখ। ২০২৩ সালের জেলা কমিটিতে তিনি সহসভাপতি ছিলেন। ২০২৬ সালের ১৬ এপ্রিল দুদকের একটি মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণ করলে তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। মামলায় পৌরসভার অর্থ ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। রমজান আলীর ক্ষেত্রে রাজনীতির পাশাপাশি স্থানীয় সরকার ও পৌর রাজনীতির অভিজ্ঞতা বড় সম্পদ। কিন্তু আইনি জটিলতা বর্তমানে তাঁর সক্রিয় রাজনীতির সবচেয়ে বড় বাধা। তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তাই আওয়ামী লীগের ভবিষ্যতের পাশাপাশি মামলার ফলাফলও গুরুত্বপূর্ণ।

গাজী কামরুল হুদা সেলিম: পুরোনো নেতৃত্বের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নাম গাজী কামরুল হুদা সেলিম। গাজী কামরুল হুদা সেলিম মানিকগঞ্জ আওয়ামী লীগের পুরোনো সংগঠকদের একজন। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং মানিকগঞ্জ পৌরসভার মেয়রের দায়িত্বও পালন করেছেন। ২০২২ সালের জেলা সম্মেলনের আগে সাধারণ সম্পাদক পদে তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হয়েছিল। আব্দুস সালামের পাশাপাশি তাঁর নামও আলোচনায় ছিল।

শেষ পর্যন্ত আব্দুস সালাম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তী কমিটিতে গাজী কামরুল হুদা সেলিমকে সহসভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেলিমের রাজনৈতিক গুরুত্বের জায়গাটি হলো তাঁর স্বতন্ত্র স্থানীয় পরিচিতি ও দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা। তাঁর বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে কারাবাস বা আত্মগোপনের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য সীমিত। ফলে অন্য কয়েকজন নেতার তুলনায় তাঁর বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে সরাসরি সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। তবে আওয়ামী লীগের রাজনীতি স্বাভাবিক হলে জেলা নেতৃত্বে পুরোনো নেতাদের পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে তাঁর নাম আলোচনায় থাকতে পারে।

সুদেব কুমার সাহা: সুদেব কুমার সাহা জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। ২০২৩ সালের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে তিনি এই দায়িত্ব পান। ২০২২ সালের সম্মেলনের আগে সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশীদের মধ্যেও তাঁর নাম ছিল। এতে বোঝা যায়, জেলা আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা মামলাগুলোতে তাঁর নাম রয়েছে। তবে তাঁর বর্তমান অবস্থান নিয়ে সাম্প্রতিক নির্ভরযোগ্য তথ্য সীমিত। সুদেব সাহার শক্তি তাঁর সাংগঠনিক ভূমিকা। আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে নতুন করে সংগঠন গড়ে তুললে মাঠপর্যায়ে সংগঠন পুনর্গঠনে অভিজ্ঞ নেতাদের প্রয়োজন হতে পারে।

কিন্তু সেই সুযোগ তৈরি হবে কি না, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। শুধু মামলা নয়, সংকটটা সাংগঠনিক ও মানিকগঞ্জ আওয়ামী লীগের বর্তমান সংকটকে শুধু মামলা ও গ্রেপ্তারের হিসাব দিয়ে দেখা হলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। কারণ ২০২২ সালের জেলা সম্মেলনের সময়ও দলটির অভ্যন্তরে নেতৃত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতা ছিল। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে একাধিক নেতা আগ্রহী ছিলেন। শেষ পর্যন্ত পুরোনো নেতৃত্বই বহাল থাকে। ২০২৩ সালে ঘোষিত পূর্ণাঙ্গ কমিটির অধিকাংশ নেতাই আগের কমিটিতে দায়িত্বে ছিলেন। অর্থাৎ নতুন নেতৃত্বের পরিবর্তে পুরোনো নেতৃত্বের ওপরই দলটি বেশি নির্ভর করেছিল। এখন সেই পুরোনো নেতৃত্বের বড় একটি অংশই আইনি ও রাজনৈতিক সংকটে। ফলে আওয়ামী লীগ যদি ভবিষ্যতে আবার সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে ফেরার সুযোগ পায়, তখন শুধু পুরোনো নেতাদের ফিরিয়ে আনা হবে, নাকি নতুন নেতৃত্বকে সামনে আনা হবে- এটি দলের জন্য বড় সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়াবে।  

মানিকগঞ্জ-১, মানিকগঞ্জ-২ ও মানিকগঞ্জ-৩ দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের প্রভাবের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল
মানিকগঞ্জ-১-এ নাঈমুর রহমান দুর্জয়, মানিকগঞ্জ-২-এ মমতাজ বেগম এবং মানিকগঞ্জ-৩-এ জাহিদ মালেক স্বপনের মতো পরিচিত মুখ ছিলেন। তাঁদের প্রত্যেকের রাজনৈতিক অবস্থান এখন আগের তুলনায় ভিন্ন। একজন কারাগারে, একজন আইনি জটিলতায়, আরেকজন আত্মগোপনে এই বাস্তবতা ভবিষ্যতের নির্বাচনী রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিনের আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো এখন নতুন বাস্তবতায় মাঠে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার সুযোগ পেয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে নির্বাচনে ফিরতে পারলেও আগের নির্বাচনী সমীকরণ হুবহু ফিরে আসবে।এমন নিশ্চয়তা নেই।

তাহলে কার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সবচেয়ে কঠিন?
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে যাঁদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে এবং যাঁরা দীর্ঘদিন প্রকাশ্য রাজনীতির বাইরে তাঁদের জন্য প্রত্যাবর্তনের পথ তুলনামূলক কঠিন। জাহিদ মালেক, নাঈমুর রহমান দুর্জয় ও মমতাজ বেগমের মতো সাবেক সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে জাতীয় রাজনীতির পরিচিতি থাকলেও আইনি জটিলতা বড় বাধা। অন্যদিকে গোলাম মহিউদ্দিন ও আব্দুস সালামের মতো জেলা সংগঠনের পুরোনো নেতাদের সামনে রয়েছে নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা ও সাংগঠনিক পুনর্গঠনের প্রশ্ন। আর সুলতানুল আজম খান আপেল, গাজী কামরুল হুদা সেলিম ও সুদেব কুমার সাহার মতো নেতাদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে দল নতুন করে সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করলে সেখানে তাঁদের কী ভূমিকা দেওয়া হয় তার ওপর।

রমজান আলীর ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সামনে আওয়ামী লীগের জন্য তিনটি বড় পরীক্ষা রয়েছে। আইনি সংকট: মামলা ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ না হলে অনেক নেতার পক্ষেই প্রকাশ্য রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া কঠিন হবে। নেতৃত্বের পুনর্বিন্যাস: পুরোনো নেতৃত্বের ওপর আবারও নির্ভর করা হবে, নাকি নতুন ও অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতৃত্ব সামনে আনা হবে এটি হবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

জনসমর্থন ফিরে পাওয়া: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভোটার। দল সাংগঠনিকভাবে ফিরতে পারলেও জনগণের কাছে আগের গ্রহণযোগ্যতা ফিরে পাবে কি না, সেটি নিশ্চিত নয়।

মানিকগঞ্জের আওয়ামী লীগের রাজনীতির ইতিহাসে জাহিদ মালেক, মমতাজ, নাঈমুর রহমান দুর্জয়, গোলাম মহিউদ্দিন, আব্দুস সালাম, সুলতানুল আজম খান আপেল, রমজান আলী, গাজী কামরুল হুদা সেলিম ও সুদেব কুমার সাহা প্রত্যেকেরই আলাদা রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে। কেউ সংসদ সদস্য ছিলেন, কেউ জেলা সংগঠনের শীর্ষ পদে ছিলেন, কেউ পৌর রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মুখ, আবার কেউ ছিলেন সাংগঠনিক নেতৃত্বের অন্যতম দাবিদার। কিন্তু ২০২৪ সালের পর তাঁদের রাজনৈতিক বাস্তবতা এক জায়গায় এসে মিলেছে। আগের মতো প্রকাশ্য রাজনৈতিক মাঠে তাঁদের উপস্থিতি নেই। এখন তাঁদের ভবিষ্যৎ শুধু ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বা অতীতের রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করছে না। বরং নির্ধারিত হবে মামলার ফলাফল, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, আইনগত ও রাজনৈতিক অবস্থান, দলের নেতৃত্বের পুনর্গঠন এবং মানিকগঞ্জের ভোটারদের নতুন রাজনৈতিক মনোভাবের ওপর। তাই এখনই বলা কঠিন এই নেতারা আবার মানিকগঞ্জের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরবেন, নাকি তাঁদের জায়গা নেবে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট মানিকগঞ্জের আওয়ামী লীগের রাজনীতি আর আগের জায়গায় নেই। সামনে যে রাজনীতি তৈরি হবে, সেখানে পুরোনো নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা, নতুন নেতৃত্বের উত্থান এবং ভোটারদের সিদ্ধান্ত।এই তিনের সমীকরণই নির্ধারণ করবে জেলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।


কালের সমাজ/এসআর

Link copied!