বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনয়ন এবং দেশীয় আইসিটি খাতের বিকাশে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরাম এর দীর্ঘদিনের গবেষণা, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ও সুপারিশের একটি বড় অংশ সম্প্রতি জারিকৃত ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এ আনুষ্ঠানিকভাবে আইনের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কর্তৃক ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (০৬ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ) তারিখে প্রণীত এই অধ্যাদেশটি ইতিমধ্যে সরকারি গেজেটে (অতিরিক্ত সংখ্যা) প্রকাশিত হয়েছে।
জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরাম (NICTF) মনে করে, এই অধ্যাদেশ কেবল একটি সাধারণ আইনি সংস্কার নয়, বরং এটি দেশের মেধাবী নতুন আইসিটি প্রতিষ্ঠান, স্টার্টআপ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) খাতের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে। ইতিপূর্বে কেবল পুরনো অভিজ্ঞতার কঠিন শর্তের কারণে নবীন উদ্যোক্তারা সরকারি কাজ থেকে বঞ্চিত হতেন, যা বাজারে সীমিত দরদাতার একচেটিয়াত্ব তৈরি করত এবং অস্বচ্ছ মূল্যায়নের কারণে সরকারি অর্থের অপচয় হতো। এই নতুন যুগান্তকারী সংস্কার বাজারে পুরনো রাঘব বোয়ালদের একচেটিয়া আধিপত্য রোধ করবে, যার ফলে নতুন আইসিটি উদ্যোক্তারা এখন থেকেই এর সুফল পেতে শুরু করবেন।
নতুন অধ্যাদেশে অন্তর্ভুক্ত হওয়া NICTF-এর প্রধান সংস্কার ও সুপারিশসমূহ:
১. নতুন প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ (ধারা ২৫(২)): যোগ্যতা নির্ধারণে এমন কোনো শর্ত আরোপ করা যাবে না, যা অপ্রয়োজনীয়ভাবে নতুন নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান বা নবীন উদ্যোক্তার অংশগ্রহণ সীমিত করে।
২. একচেটিয়া অভিজ্ঞতার শর্ত বিলোপ (ধারা ২৫(৩)): কেবল দীর্ঘমেয়াদি অভিজ্ঞতা, উচ্চ বার্ষিক টার্নওভার, সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা অথবা একক বৃহৎ চুক্তির অভিজ্ঞতাকে বাধ্যতামূলক যোগ্যতা হিসেবে নির্ধারণ করা যাবে না। তবে প্রকল্পের জটিলতা ও ঝুঁকি বিবেচনায় বিশেষ শর্ত আরোপ করা যাবে।
৩. দেশীয় শিল্প ও পণ্যের অগ্রাধিকার (নতুন ধারা ২৫ক): দেশীয় শিল্পের বিকাশ, স্থানীয় উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারি ক্রয়ে বাংলাদেশে উৎপাদিত বা প্রস্তুতকৃত পণ্য ও আইসিটি সেবাকে অগ্রাধিকার প্রদান বা নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের দেশীয় পণ্য ক্রয় বাধ্যতামূলক করতে পারবে সরকার।
৪. স্টার্টআপ, এসএমই ও নারীদের জন্য বিশেষ সুযোগ (ধারা ২৬, ৩১ক ও ৩৬ক): দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সুরক্ষা এবং নতুন দরপত্রদাতা, অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র দরপত্রদাতা, নারী দরপত্রদাতা অথবা সুযোগবঞ্চিত ব্যক্তিদের ক্রয় প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকার যোগ্যতার শর্তাদি শিথিল করতে পারবে। এ ছাড়া, পূর্ববর্তী অনধিক ২০ বছরের মধ্যে বৈধ লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও অনুকূল পরিবেশের অভাবে সরকারি ক্রয়ে অংশ নিতে না পারা ব্যক্তিদের "সুযোগবঞ্চিত ব্যক্তি" হিসেবে প্রথমবারের মতো আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
৫. দরপত্র উন্মুক্তকরণে স্বচ্ছতা (ধারা ৩১(১)(ঝ) ও ৪৭): কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাবের আনুপাতিক মূল্যায়নে `Sustainability` বা টেকসই উপাদান যুক্ত করা হয়েছে। কারিগরি প্রস্তাবের মূল্যায়ন সম্পন্ন ও অনুমোদিত না হওয়া পর্যন্ত আর্থিক প্রস্তাবসমূহ নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ করতে হবে। এরপর আগ্রহী দরদাতাদের উপস্থিতিতে সংরক্ষিত আর্থিক প্রস্তাব ও দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয় উন্মুক্ত করে মূল্যায়ন সম্পন্ন করতে হবে।
৬. প্রকৃত মালিকানা প্রকাশ বাধ্যতামূলক (ধারা ৫৩ ও ৬৩): চুক্তিস্বাক্ষরের পর কৃতকার্য দরপত্রদাতা বা পরামর্শকের প্রকৃত মালিকানা বিষয়ক ও চুক্তিস্বাক্ষরসংক্রান্ত তথ্যাদি সহযোগে নোটিশ প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
৭. নিষিদ্ধকরণের আগে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ (ধারা ৬৪): কোনো প্রতিষ্ঠানকে নিষিদ্ধকরণের (Blacklisting) প্রক্রিয়া শুরুর আগে অভিযোগের বিবরণসহ লিখিতভাবে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করতে হবে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের যুক্তিসঙ্গত সুযোগ দিতে হবে।
৮. BPPA-কে প্রশিক্ষণ ও গবেষণার দায়িত্ব (নতুন ধারা ৬৬ক): বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (BPPA) এই আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে ক্রয়কারী ও সংশ্লিষ্ট জনবলের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কর্মশালা ও সেমিনার আয়োজন এবং ক্রয় প্রক্রিয়ার আধুনিকায়নের জন্য গবেষণা পরিচালনা করবে।
NICTF-এর ভূমিকা ও `PPR Reform Working Group`:
সরকারি প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার লক্ষ্যে NICTF একটি বিশেষ ‘PPR Reform Working Group’ গঠন করেছিল। এই ওয়ার্কিং গ্রুপের ১২ জন সদস্যের অক্লান্ত পরিশ্রম ও তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের ফলেই এই নীতিগত সংস্কার সম্ভব হয়েছে। সদস্যরা হলেন—১. রাফেল কবির, ২. আব্দুর রাজ্জাক রুপম, ৩. মোঃ মামুন অর রশিদ, ৪. মিজানুর রহমান, ৫. মো: আনোয়ার সাদাত, ৬. ইলিয়াস মোল্লাহ, ৭. আবু সালেহ মোহাম্মদ জুবায়ের আলম, ৮. মোঃ ফারাবী, ৯. মাহতাবুর রহমান, ১০. সানাউল করিম, ১১. সজিব বড়ুয়া এবং ১২. মিরন খান।
যা এখনও বাকি:
NICTF এই ঐতিহাসিক অর্জনকে স্বাগত জানালেও মনে করিয়ে দেয় যে, আইসিটি খাতের পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের কাজ এখনও শেষ হয়নি। নিম্নলিখিত বিষয়গুলো এখনও বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে:
১. আইসিটি খাতের জন্য পৃথক `SLT (Significantly Low-priced Tender) Guideline` তৈরি
২. `ICT-STD` (Standard Tender Document) প্রণয়ন
৩. একটি স্বাধীন `ICT Specification Review Committee` গঠন
৪. নলেজ ট্রান্সফার ও হ্যান্ডওভার সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট বিধান যুক্ত করা
এই লক্ষ্যগুলো পূরণে NICTF সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের সাথে তাদের সংলাপ ও নীতিনির্ধারণী গবেষণা অব্যাহত রাখবে।
উদ্ধৃতি:
"এই অর্জন আমাদের প্রযুক্তি সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। আইসিটি খাতের জন্য একটি স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ক্রয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে আমরা আমাদের সংলাপ ও গবেষণা অব্যাহত রাখব। বিশেষ করে PPR Reform Working Group-এর সদস্যদের প্রতি আমরা গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।"
— NICTF (Nationalist ICT Forum)
- সমাপ্ত -
প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে:
জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরাম (Nationalist ICT Forum - NICTF) হলো বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (ICT) খাতের পেশাজীবী, গবেষক, উদ্যোক্তা এবং প্রযুক্তিবিদদের নিয়ে গঠিত একটি বিশেষায়িত প্ল্যাটফর্ম। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে।
এটি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর একটি স্বীকৃত সহযোগী ও সমমনা পেশাজীবী সংগঠন (Sister concern)। বিএনপির আদর্শ ও ভিশনের সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশের আইসিটি পলিসি, ডিজিটাল গভর্নেন্স এবং প্রযুক্তিভিত্তিক জাতীয় উন্নয়নে ভূমিকা রাখা এই ফোরামের মূল লক্ষ্য। ফোরামটি বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, ইলেকট্রনিক্স এবং সামগ্রিক আইসিটি খাতের সংস্কার ও সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন সেমিনার, কর্মশালা ও সংলাপের আয়োজন করে থাকে। প্রযুক্তি খাতে কর্মরত জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার ব্যক্তিদের ঐক্যবদ্ধ করা এবং দেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও আইসিটি পলিসি তৈরিতে বুদ্ধিবৃত্তিক পরামর্শ দেওয়া এদের প্রধান কাজ।

