মহাকাশে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে থাকা মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার একটি পুরোনো টেলিস্কোপ পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে। সুইফট অবজারভেটরি নামের ওই টেলিস্কোপটি উদ্ধারে নাসার অভিযান ব্যর্থ হওয়ার পর এটি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে নিচে নামতে শুরু করেছে। আগামী ৬ নভেম্বরের মধ্যে যেকোনো দিন এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করতে পারে।
সংবাদমাধ্যম ইউএসএ টুডে বলছে, মহাকাশে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে থাকা নাসার একটি পুরোনো টেলিস্কোপ এখন আর কক্ষপথে নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না। বিভিন্ন পূর্বাভাস অনুযায়ী, কয়েক দিনের মধ্যেই সুইফট অবজারভেটরি পৃথিবীর দিকে নেমে আসবে। এর কিছু অংশ বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় জ্বলেপুড়ে গেলেও কিছু অংশ টিকে থাকতে পারে এবং সাগরে আছড়ে পড়তে পারে।
নাসা ও তাদের বাণিজ্যিক অংশীদাররা প্রায় তিন মাস আগে সুইফট টেলিস্কোপটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল। পরিকল্পনা ছিল, একটি মহাকাশযান পাঠিয়ে টেলিস্কোপটিকে ধরে আরও উঁচু কক্ষপথে নিয়ে যাওয়া, যাতে সেটি আরও কিছুদিন মহাকাশে কাজ করতে পারে। কিন্তু সেই চেষ্টা সফল হয়নি।
অবশ্য নাসার কর্মকর্তারা শুরু থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন, এ অভিযান সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ, এর আগে কোনো বাণিজ্যিক রোবোটিক মহাকাশযান দিয়ে এমন স্যাটেলাইট উদ্ধারের চেষ্টা করা হয়নি। সুইফটকে মহাকাশে থাকা অবস্থায় মেরামত বা রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও তৈরি করা হয়নি।
এদিকে উদ্ধার অভিযান যে আর সফল হচ্ছে না, তা নিশ্চিত হওয়ার পর নাসা সিদ্ধান্ত নেয় যে পৃথিবীতে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত সুইফটকে দিয়ে যতটা সম্ভব মহাবিশ্বের তথ্য সংগ্রহ করা হবে। ফলে টেলিস্কোপটির হাতে থাকা শেষ সময়টুকু কাজে লাগিয়ে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।
সুইফট অবজারভেটরি কী?
২০০৪ সালে উৎক্ষেপণের পর নাসার সুইফট অবজারভেটরি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করেছে এবং মহাবিশ্বের নানা ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেছে। তবে স্যাটেলাইটটির প্রধান লক্ষ্য ছিল গামা-রশ্মির বিস্ফোরণ পর্যবেক্ষণ করা। বিশাল নক্ষত্রের ভয়াবহ মৃত্যুর ফলে এসব বিস্ফোরণ ঘটে। এগুলোকে মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বিস্ফোরণের মধ্যে গণ্য করা হয়।
স্যাটেলাইটটিতে তিনটি বহুতরঙ্গদৈর্ঘ্যের টেলিস্কোপ ছিল। এগুলোর মাধ্যমে দৃশ্যমান আলো, অতিবেগুনি রশ্মি, এক্স-রে এবং গামা-রশ্মি থেকে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হতো।
ওয়াশিংটনে নাসার সদর দপ্তরের অ্যাস্ট্রোফিজিকস বিভাগের পরিচালক শন ডোমাগাল-গোল্ডম্যান এক বিবৃতিতে বলেন, ‘পরিবর্তনশীল মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণা এগিয়ে নিতে সুইফট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দ্রুত সাড়া দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা যে পুরো গবেষকসমাজের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা দেখানো জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের এক বিপ্লবেরও অংশ ছিল এটি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সুইফট আমাদের কাছে বহু তরঙ্গদৈর্ঘ্যে পর্যবেক্ষণের এক অসাধারণ তথ্যভান্ডার রেখে যাচ্ছে, যা আগামী কয়েক দশক ধরে নতুন আবিষ্কারে সহায়তা করবে।’

সুইফট উদ্ধারে নাসার অভিযান ব্যর্থ
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের কাছাকাছি পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে অবস্থান করছিল সুইফট অবজারভেটরি। ২০২৪ সালের শরৎকাল থেকে সৌরঝড়ের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় স্যাটেলাইটটি নাসার ধারণার চেয়ে দ্রুত কক্ষপথ থেকে নিচে নেমে আসতে শুরু করে।
এ কারণেই ২০২৬ সালে টেলিস্কোপটি রক্ষায় উদ্ধার অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় নাসা। পরিকল্পনা ছিল, আরেকটি মহাকাশযান পাঠিয়ে সুইফটকে আরও উঁচু কক্ষপথে তুলে দেয়া হবে। নাসার সঙ্গে ৩ কোটি ডলারের চুক্তিতে অ্যারিজোনাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ক্যাটালিস্ট স্পেস পাঁচ ফুট উঁচু ‘লিংক’ মহাকাশযান তৈরি করে। নর্থরপ গ্রুম্যানের একটি রকেটে চড়ে মহাকাশে যায় সেটি।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত অভিযানটি ব্যর্থ হয়। এরপর চলকি বছরের জুলাইয়ে মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ থেকে উৎক্ষেপণের কয়েক সপ্তাহ পর গত ১৯ আগস্ট নাসা জানায়, লিংক মহাকাশযানে সমস্যা দেখা দিয়েছে। ফলে সেটি সুইফট অবজারভেটরির কাছে পৌঁছাতে পারবে না। একই সঙ্গে রোবোটিক বাহু দিয়ে টেলিস্কোপটি ধরে প্রায় ৩৭০ মাইল উচ্চতায় তুলে দেয়ার পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।
কখন পৃথিবীতে ফিরে আসবে সুইফট অবজারভেটরি?
উদ্ধার অভিযান বন্ধ করার নাসার সিদ্ধান্তের ফলে সুইফটের পরিণতি কার্যত নিশ্চিত হয়ে যায়। ২০২৬ সালের শেষভাগে পৃথিবীতে ফিরে আসার কথা ছিল স্যাটেলাইটটির।
২৩ অক্টোবর অভিযান নিয়ে সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যে নাসা জানায়, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সুইফট পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে স্যাটেলাইটটি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে নিচে নামছে। তাই ঠিক কোন দিন এটি বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।
বেশির ভাগ পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ৬ নভেম্বর শুক্রবারের মধ্যে যেকোনো দিন এটি বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করতে পারে। তবে মহাকাশের ধ্বংসাবশেষ পর্যবেক্ষণকারী যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অ্যারোস্পেস করপোরেশনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী বুধবার (৪ নভেম্বর) টেলিস্কোপটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে।
এদিকে দ্রুত নিচে নামতে শুরু করায় সুইফট অবজারভেটরি এখন কার্যক্রম বন্ধ করেছে। ২০ অক্টোবরের হিসাবে এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ১৭১ মাইল উচ্চতায় কক্ষপথে ছিল। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের ২৫০ মাইল উচ্চতার কক্ষপথের চেয়েও অনেক নিচে ছিল স্যাটেলাইটটি।

বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় নাসার টেলিস্কোপ দেখা যাবে?
বায়ুমণ্ডল ভেদ করে নামার সময় অবজারভেটরিটির বেশির ভাগ অংশ নিরাপদে পুড়ে যাওয়ার কথা। তবে এর কিছু ঘন অংশ বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের ধাক্কা সামলে সাগরে পড়তে পারে। কিন্তু খালি চোখে এর কোনো অংশের পতন দেখা কঠিন হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের নির্ভুল যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাকু কম্পোনেন্টসের মহাকাশ প্রকৌশলী ডিন স্লাডেন ইউএসএ টুডে নেটওয়ার্ককে দেয়া এক বিবৃতিতে বলেন, ‘মাত্র কয়েকটি ছোট, পুড়ে যাওয়া টুকরো নিচে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেগুলোর কোনোটি দেখে টেলিস্কোপ বলে চেনার উপায় থাকবে না।’
কোথায় আছড়ে পড়তে পারে সুইফট টেলিস্কোপ?
সুইফটের কক্ষপথ বিষুবরেখার প্রায় ২১ ডিগ্রির মধ্যে থাকা একটি অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত। এর বেশির ভাগই সাগর। তবে ওই অঞ্চল আফ্রিকা, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার জনবসতিপূর্ণ কিছু এলাকার ওপর দিয়েও গেছে বলে জানান স্লাডেন।
সুইফট অবজারভেটরি সম্ভবত সাগর অথবা জনবসতি কম এমন এলাকায় আছড়ে পড়বে। তাই এটি কারও জন্য বিপদের কারণ হওয়ার আশঙ্কা খুবই কম।
স্লাডেন বলেন, ‘এ আকারের স্যাটেলাইট নিয়মিতই বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। আর মহাকাশযাত্রার প্রায় ৭০ বছরের ইতিহাসে মহাকাশের ধ্বংসাবশেষ পড়ে কোনো মানুষের মৃত্যু হয়নি।’
কালের সমাজ/এসআর

