ষড়ঋতুর ছন্দময় খেলায় প্রকৃতিতে এখন পুরোপুরি হেমন্তের আমেজ। ঋতুর পালাবদলে মাগুরার বিভিন্ন এলাকায় থোকায় থোকায় ফুটেছে মাতাল করা ঘ্রাণের ছাতিম ফুল। শুভ্র ফুলের অপার সৌন্দর্য ও এর উগ্র সুবাস গ্রামীণ জনপথ থেকে শুরু করে শহরের অলিগলি পর্যন্ত প্রকৃতির স্নিগ্ধতায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
চিরসবুজ ও দীর্ঘকায় উদ্ভিদ ছাতিমের বৈজ্ঞানিক নাম- ‘অ্যালস্টনিয়া স্কলারিস’। স্থানীয়ভাবে এটি কোথাও ‘ছাতিয়ান’ বা ‘ছাইত্যেন’ নামেও পরিচিত। এর কান্ডের উপরিভাগ পত্রপল্লবে ছাতার মতো ঝাঁপটানো বলেই এর এমন নামকরণ। শরতের মাঝামাঝি থেকে হালকা সবুজ আভার প্রলেপ মাখা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছাতিম ফুল থোকায় থোকায় ফুটতে শুরু করে এবং হেমন্তের শেষভাগ পর্যন্ত এর বিস্তার থাকে। গাছের শাখা-প্রশাখার অগ্রভাগে গুচ্ছ গুচ্ছ ফুলে মৌমাছির মধু আহরণের দৃশ্য গ্রামীণ প্রকৃতিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
ছাতিম ফুলের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর তীব্র সুবাস। সন্ধ্যা ঘনাতেই ফুলগুলো সুবাস ছড়াতে শুরু করে এবং রাত যত গভীর হয়, বাতাসের ঝিরি ঝিরি হাওয়ায় তার তীব্রতা তত বাড়তে থাকে। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে তা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। মাগুরা সদর, মহম্মদপুর, শাখিলা এবং শ্রীপুর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে মহম্মদপুর উপজেলা সদরের বিটিসিএল চত্বরসহ বিভিন্ন এলাকার ছাতিম ফুলের সুবাস পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বিমোহিত করছে।
বাংলা সাহিত্যে ছাতিম ফুলের এক অনন্য অবস্থান রয়েছে। ঔপন্যাসিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ ও ‘আরণ্যক’ উপন্যাসে ছাতিম ফুলের সুবাস ও সৌন্দর্যের চমৎকার বর্ণনা পাওয়া যায়। নিসর্গবিদ দ্বিজেন শর্মা ছাতিমকে হেমন্তের অঙ্গনে শীতকে অভ্যর্থনা জানানো একমাত্র তরু হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কবি মো. জায়েদ আজিজ ও গোলাম মোহাম্মদসহ বহু সাহিত্যিক তাদের কবিতায় ছাতিম ফুলের মাদকতাময় গন্ধকে প্রকৃতির শান্ত রূপের সঙ্গে একাত্ম করে ফুটিয়ে তুলেছেন।
সৌন্দর্য ও সুবাসের পাশাপাশি ছাতিম গাছের রয়েছে বহুমুখী ভেষজ গুণ। এর ছাল চূর্ণ ও কষ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। এছাড়া এর নরম কাঠ দিয়ে কাঠপেন্সিল ও স্লেট তৈরি করা হয়। যান্ত্রিকতার মাঝেও ছাতিমের এই বুনো সৌরভ ও উপস্থিতি প্রকৃতিপ্রেমীদের মনে হেমন্তের নিখাদ সৌন্দর্য ও মুগ্ধতা ছড়িয়ে দিচ্ছে।
হাসনাত হান্নান তামিম
মহম্মদপুর, মাগুরা

