ঢাকা সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩

জ্বালানি সঙ্কট সমাধানে পরিকল্পনা বিরোধিতার আভাসও স্পষ্ট

জেলা প্রতিনিধি, দিনাজপুর | সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ০৮:৩০ পিএম জ্বালানি সঙ্কট সমাধানে পরিকল্পনা  বিরোধিতার আভাসও স্পষ্ট

বিদ্যমান জ্বালানি সঙ্কট মোকাবিলায় প্রাথমিক জ্বালানি বহুমুখীকরণের পরিকল্পনা করেছে সরকার। জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্পষ্ট বক্তব্য ছাড়াও  মিডিয়া ও  ব্যবসায়ীদের নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এক বিস্তারিত রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমেরিকান চেম্বারের অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তব্যে কয়লা বা স্থানীয় সম্পদ ব্যবহারের বিকল্প নেই বলে মতামত দেন। দেশের বিদ্যমান জ্বালানি সম্পদ ও সরবরাহ সঙ্কট বিবেচনায় দেশীয় সম্পদ বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের কয়লা ব্যবহারের কথা স্পষ্ট করেই সরকার বলে চলেছে। বিশ্বের বড় বড় দেশ বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারতসহ, চীন, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, কানাডা ও রাশিয়া তাদের কয়লা উত্তেোলন করে ব্যবহার করে চলেছে। দেশে দেশে কয়লা উত্তোলন ও ব্যবহার হচ্ছে বলেই বাংলাদেশ এখনও কয়লাভিত্তি কেন্দ্রের জন্য কয়লা আমদানি করার সুযোগ পাচ্ছে। 

মানে বাংলাদেশ বাংলাদেশ ছাড়া ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশও বিপুল কয়লা উত্তোলন করে চলেছে। এসব দেশের উদাহরণ নিয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর  জোর দেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।  বর্তমানে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা গড়ে ৭ হাজার মেগাওয়াটের ওপর  আরও নতুন প্ল্যান্ট করতে সরকার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে দেশী সম্পদ উত্তোলন ও ব্যবহারের মাধ্যমে আমদানি কমানো গেলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের চেয়ে বড় জাতীয় স্বার্থে আর কিছু নেই বলে ভাবা হচ্ছে।  এদিকে সরকারের এই পথনকশা বাস্তবায়নে বিরোধিতাও ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। সরকারের পথনকশার মধ্য থেকে দেশি সম্পদ আহরণ বিশেষ করে কয়লা উত্তোলন অংশের বিরোধিতায় প্রকাশ্যে বক্তব্য এসেছে। এমনকি ফুলবাড়িতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনকে রুখে দেয়ার জন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সভা-মিছিল হয়েছে। এই কয়লা মজুদ এলাকার  পার্বতীপুর, বিরামপুর নবাবগঞ্জে কোন প্রতিবাদের খবর মেলেনি।  জাতীয় স্তরে জাতীয় দৈনিকে কলাম, সাক্ষাৎকার ও প্রবন্ধের মাধ্যমে সরকারের পথ নকশার স্থানীয় সম্পদ কয়লা ব্যবহারের অংশটির বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা আসা শুরু হয়েছে। 

ধারণা করা যায়,সত্য-মিথ্যার মিশেলে এরকম বিরোধিতা আরও আসতে থাকবে।  দেশের নিরপক্ষে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা প্রায় সবাই গত দুই তিন যুগ ধরে জ্বালানি বহুমুখীকরণের ওপর জোর দিয়ে আসছেন। অতীতের কোন সরকারই জ্বালানি বহুমুখীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ না করায় দেশের জ্বালানি  ব্যবহারের ৬০ ভাগের বেশি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে। সম্পূর্ণ আমদানি নির্ভরতার দেশের বিপুল মুদ্রা দৈনিকই বিদেশে চলে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা জানান,  জ্বালানি নিরাপত্তায় প্রাথমিক জ্বালানির একক উৎসের ওপর নির্ভর করে  কোন দেশই চলতে পারে না। বাংলাদেশের বিপুল গ্যাস মজুদের দিন এখন শেষ। বর্তমানে যে গ্যাস আছে, তা আগামী ৭ থেকে ১০ বছর চলতে পারে। নীতিনির্ধারকরা তাই বহুমুখী জ্বালানি উৎসের অনুসন্ধান করেছেন। তাদের সামনে সহজ, সস্তা ও সহজলভ্য সমাধান হিসাবে দেশীয় কয়লার বিষয়টি সামনে রয়েছে। একই বিবেচনায়  সরকার গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর জোর দিয়েছে।  কয়লার ক্ষেত্রে উন্মুক্ত পদ্ধতি হোক বা আন্ডারগ্রাউন্ড সবক্ষেত্রেই স্থানীয়দের পুনর্বাসন, চাকরির মধ্য দিয়ে স্থায়ীদের জীবনমান উন্নত করার বিষয়টি সামনে আসবে। 

এর  চ্যালেঞ্জের কথা চিন্তা করে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদের স্থানীয়দের পুনর্বাসনের মাধ্যমে কয়লা তোলা হবে বলে উল্লেখ করেছেন।  এদিকে সরকারের পথনকশায় অন্যান্য ক্ষেত্রে বিরোধিতা জোরালো না হলেও স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার বা কয়লা উত্তোলনের বিরোধিতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে  উঠছে। যুক্তি , উন্মুক্ত খনি করলেই পুরো উত্তরাঞ্চলের পানি সম্পদ, প্রকৃতি ও কৃষি ব্যবস্থা ধ্বংস হবে। তবে জানা যায়, উত্তরাঞ্চলের সীমান্তের কাছেই ভারতের ঝাড়খন্ডের হাজারীবাগ, আসানসোলে শত শত উন্মুক্ত কয়লা খনি থেকে কয়লা উত্তোলন করা হচ্ছে। শুধু কয়লা উন্নয়নের ওপর ভিত্তি করেই ভারতের টাটা কোম্পানি জামসেদপুর টাটানগর নামে একটি শহরে গড়ে তুলেছে এবং সেখানে কয়লাভিত্তিক নানা শিল্প কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে, উৎপাদিত হচ্ছে বিদ্যুৎ।  একদিকে জাতীয় ও স্থানীয় কিছু মানুষের বিরোধিতা,  অন্যদিকে  স্থানীয় মানুষের পুনর্বাসন, পানি  ও কৃষি ব্যবস্থাপনা, যুবকদের কর্মসংস্থান ও জীবিকা পুণরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে  জাতীয় সম্পদ কয়লাকে দেশের স্বার্থে সরকার কীভাবে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

কালের সমাজ/কে.পি

গ্রাম-গঞ্জ বিভাগের আরো খবর

Link copied!