ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। চারপাশে নীরবতা। অথচ দিনের ব্যস্ততা শুরু হয়ে যেত আব্দুর রশিদের। হাতে জাতীয় দৈনিক পত্রিকার বান্ডিল, কাঁধে ব্যাগ—ছুটে চলতেন এক বাজার থেকে আরেক বাজারে। কারও হাতে ইত্তেফাক, কারও হাতে সংবাদ, আবার কারও হাতে যুগান্তর, প্রথম আলো কিংবা কালের কণ্ঠ। এভাবেই মানুষের ঘরে ঘরে প্রতিদিনের খবর পৌঁছে দিয়েছেন তিনি।
এক-দুই বছর নয়, দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে পত্রিকা বিলির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার রামমোহন বাজারের আব্দুর রশিদ। সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে পত্রিকা বিলি করে স্থানীয় মানুষের কাছে তৈরি করেছিলেন আলাদা পরিচিতি।
সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। প্রযুক্তির অগ্রগতিতে এখন মানুষের হাতে হাতে স্মার্টফোন। ফেসবুক, অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মুহূর্তেই পাওয়া যায় দেশ-বিদেশের খবর। ফলে ধীরে ধীরে কমতে থাকে ছাপা পত্রিকার চাহিদা। সেই পরিবর্তনের ঢেউ এসে লাগে আব্দুর রশিদের জীবনেও।
২০১৭ সালে পত্রিকার হকারি ছেড়ে দেন তিনি। এখন রামমোহন বাজারে সবজি বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন। পেশা বদলালেও পত্রিকা বিলির সেই তিন দশকের স্মৃতি এখনও তার মনে জ্বলজ্বল করছে।
আব্দুর রশিদ বলেন, ‘একসময় প্রতিদিন প্রায় ২০০ কপি পত্রিকা বিক্রি করেছি। ভোরে পত্রিকা হাতে নিয়ে বের হতাম। চান্দিনা উপজেলার হারং, মাইজখার, এতবারপুরসহ বিভিন্ন এলাকা এবং বরুড়া উপজেলার রামমোহন বাজার ও আশপাশের এলাকায় পত্রিকা পৌঁছে দিতাম।’
তার হাতে ছিল দেশের বহুল প্রচারিত বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক। এর মধ্যে সংবাদ, ইত্তেফাক, ইনকিলাব, যুগান্তর, প্রথম আলো, দৈনিক খবর, ভোরের কাগজ, কালের কণ্ঠ ও আমার দেশসহ বিভিন্ন পত্রিকা তিনি বিক্রি করেছেন।
তিনি জানান, পত্রিকা অফিস থেকে বিক্রির ওপর কমিশন পেতেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শতকরা ৩০ টাকা কমিশন পেতেন। সেই আয় দিয়েই চলত সংসার।
দীর্ঘদিন পত্রিকা বিলি করতে গিয়ে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা এবং নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরি হয়। পেশাটিকে শুধু জীবিকার মাধ্যম হিসেবে নয়, দায়িত্ব হিসেবেও দেখেছেন তিনি।
আব্দুর রশিদ বলেন, ‘মানুষের কাছে সময়মতো পত্রিকা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করতাম। অনেকেই অপেক্ষা করে থাকতেন। কারও বাসায় একটু দেরি হলে জানতে চাইতেন—আজ পত্রিকা আসেনি কেন?’
একসময় তার সঙ্গে আরও ছয়জন এই পেশায় ছিলেন। অর্থাৎ মোট সাতজন পত্রিকা বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সময়ের পরিবর্তনে তাদের অনেকেই পেশা বদলেছেন।
আব্দুর রশিদ বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে সাতজন ছিলাম। এখন চারজন পত্রিকার সঙ্গে কাজ করছে। সিদ্দিক, নারায়ণ বাবু ও জামাল এখনও পত্রিকার সঙ্গে কাজ করছেন। আর সামছুল হক, আলিউল্লাহ ও আমি এখন আর পত্রিকা বিক্রির কাজ করছি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০১৭ সালে আমি পত্রিকার কাজ ছেড়ে দিয়েছি। এখন বাজারে সবজি বিক্রি করি। সত্যি বলতে কী, বর্তমানে সবজি বিক্রি করেই আগের চেয়ে ভালো আছি।’
তবে পেশা বদলালেও তার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ অধ্যায়জুড়ে রয়েছে সংবাদপত্র। তিন দশক ধরে প্রতিদিন মানুষের হাতে খবর পৌঁছে দেওয়া আব্দুর রশিদের জীবন যেন ছাপা সংবাদপত্র থেকে ডিজিটাল যুগে পরিবর্তনের একটি বাস্তব গল্প।
একসময় একটি পত্রিকার জন্য মানুষ ভোরে অপেক্ষা করতেন। পত্রিকা হাতে পাওয়ার পর চায়ের কাপ নিয়ে বসে যেতেন খবর পড়তে। সেই সময়ের সঙ্গে আজকের সময়ের পার্থক্য অনেক। এখন একটি স্মার্টফোনেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দেশ-বিদেশের খবর পৌঁছে যায় মানুষের হাতে।
আর সেই পরিবর্তনের সাক্ষী আব্দুর রশিদ। তিন দশক ধরে পত্রিকার বান্ডিল কাঁধে নিয়ে ছুটে চলা মানুষটি এখন বাজারে সবজির ঝুড়ি নিয়ে বসেন। জীবিকার পথ বদলেছে, বদলেছে সময়ও। কিন্তু মানুষের হাতে খবর পৌঁছে দেওয়ার সেই দীর্ঘ জীবনের স্মৃতি এখনও তার কাছে অমলিন।
আব্দুর রশিদের গল্প শুধু একজন হকারের পেশা বদলের গল্প নয়; এটি ছাপা সংবাদপত্রের দীর্ঘ পথচলা এবং ডিজিটাল যুগে সংবাদ গ্রহণের পরিবর্তনেরও একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
কালের সমাজ/এসআর

