সিএইচটি সম্প্রীতি জোটের সাংগঠনিক কাঠামো, গঠনতন্ত্র, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্ব নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে সংগঠনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা, নেতৃত্ব ও নেতা-কর্মীদের একাংশ।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বান্দরবান প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তারা এ আহ্বান জানান।
বক্তারা বলেন, বাঙালি-অবাঙালি সব মানুষের শান্তি, সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই সিএইচটি সম্প্রীতি জোট গঠিত হয়েছে। সংগঠনের গঠনতন্ত্র, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি রক্ষায় বর্তমান পরিস্থিতি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি।
সমাবেশে মো. আবদুর রহিম বলেন, সংগঠনের গঠনতন্ত্র ও সাংগঠনিক নিয়মনীতি সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হওয়া প্রয়োজন। ব্যক্তিগত মতপার্থক্য বা নেতৃত্বের বিরোধ যেন সংগঠনের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত না করে, সেদিকে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, সংগঠনের আর্থিক লেনদেন ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। আয়-ব্যয়ের হিসাব, রসিদ-ভাউচারসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র সদস্যদের সামনে উপস্থাপন করা হলে বিভ্রান্তি ও ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
উছাইং অং মারমা বলেন, পাহাড়ে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই সংগঠনটি কাজ করছে। কোনো সাংগঠনিক সংকট যেন বাঙালি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি না করে, সেদিকে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
জু জু ত্রিপুরা বলেন, কোনো জনগোষ্ঠীর অধিকার অস্বীকার করা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি এক পক্ষের অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে অন্য পক্ষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার ক্ষুণ্ন করাও উচিত নয়। সংলাপ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমে বিরাজমান সমস্যার সমাধান করতে হবে।
শরীফুল ইসলাম বলেন, সংগঠনের নাম, লোগো, পদ-পদবি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের ক্ষেত্রে গঠনতন্ত্র ও অনুমোদিত সাংগঠনিক কাঠামো অনুসরণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কমিটি গঠন বা বিলুপ্তির সিদ্ধান্তও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
ইফতেখার ইফান বলেন, অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের পরিবর্তে নথি ও প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত ঘটনা যাচাই করা প্রয়োজন। সংগঠনের স্বার্থে সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন এবং উত্তেজনা এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।
বক্তারা অভিযোগ করেন, কমিটি বিলুপ্ত, নতুন কমিটি ঘোষণা, সাংগঠনিক ক্ষমতার ব্যবহার, আর্থিক লেনদেন ও সংগঠনের সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন ও অভিযোগ ওঠায় সংগঠনের অভ্যন্তরে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, আর্থিক নথি, রসিদ-ভাউচার এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণের পাশাপাশি লিখিত ও স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত প্রকাশের দাবি জানান তারা।
তারা বলেন, সংগঠনের অর্থ ও সম্পদের নিয়মিত হিসাব প্রকাশ করতে হবে। বিষয়টি কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা বাঙালি-অবাঙালি বিভাজনের নয়; বরং গঠনতন্ত্র, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য।
সিএইচটি সম্প্রীতি জোটের সদস্য সচিব ইখতিয়ার উদ্দিন ইমন বলেন, সংগঠনের শৃঙ্খলা নষ্টের অভিযোগে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে পাইশিখইকে আগেই বরখাস্ত করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, প্রতিষ্ঠাকালীন আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার থোয়াই চিং মং চাক ও সদস্য সচিব হিসেবে সংগঠনের নীতিমালা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অনুমোদিত নেতৃত্বের হাতেই থাকবে। সংগঠনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে রাজপথে জবাব দেওয়ার ঘোষণাও দেন তিনি।
জোটের পক্ষ থেকে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ কোনো একক জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে নয়; বরং সব জনগোষ্ঠীর সমান অধিকার, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হওয়া উচিত। সংগঠনটি শান্তি, সম্প্রীতি, ন্যায়বিচার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে।
বক্তারা আরও বলেন, কোনো জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকার অস্বীকার করা যাবে না। একই সঙ্গে এক পক্ষের অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে অন্য পক্ষের অধিকার, নিরাপত্তা বা মর্যাদা ক্ষুণ্ন করাও গ্রহণযোগ্য নয়। সংলাপ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে পাহাড়ের সমস্যার সমাধান করতে হবে।
এ সময় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান, কৃষি, ব্যবসা এবং নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়।
জোটের পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা কোনো জনগোষ্ঠী বা মানুষের বিরুদ্ধে নয়; অন্যায়, বৈষম্য ও অধিকারবঞ্চনার বিরুদ্ধে। সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ, বিভেদের পরিবর্তে সম্প্রীতি এবং বৈষম্যের পরিবর্তে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগঠনটি কাজ করে যাবে।
শান্তিপূর্ণ ও দায়িত্বশীল ভূমিকার আহ্বান
সমাবেশ থেকে সিএইচটি সম্প্রীতি জোটের সকল নেতা-কর্মী, সদস্য, শুভাকাঙ্ক্ষী ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের প্রতি দায়িত্বশীল ও শান্তিপূর্ণ ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়।
কোনো ধরনের ব্যক্তিগত আক্রমণ, অপপ্রচার, বিভ্রান্তিকর তথ্য কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্তেজনা সৃষ্টি না করে প্রমাণ, নথি ও গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতে বিষয়গুলো উপস্থাপনের আহ্বান জানান বক্তারা।
একই সঙ্গে সংগঠনের সংশ্লিষ্ট নেতৃত্বের প্রতি গঠনতন্ত্র, সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত, কমিটি গঠন ও বিলুপ্তির প্রক্রিয়া, আর্থিক হিসাব এবং সংগঠনের সম্পদ ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথি সদস্যদের সামনে স্বচ্ছভাবে উপস্থাপনের আহ্বান জানানো হয়।
অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের পরিবর্তে নিরপেক্ষ যাচাই ও আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বক্তারা বলেন, সংগঠনকে শক্তিশালী করার পথ বিভাজন নয়; বরং স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক আস্থা।
পাহাড়ের শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষায় সকল জনগোষ্ঠী, সামাজিক সংগঠন, জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যম ও সচেতন নাগরিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, “অধিকার সবার, নিরাপত্তা সবার, মর্যাদা সবার—আর সেই অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা।”
কালের সমাজ/এসআর

