পার্বত্য জেলার বান্দরবানের লামা উপজেলায় উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার হাত ধরে পাহাড়ে পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। সরই ইউনিয়নের দুর্গম ডলুছড়ি বাজার থেকে লুলাইং বাজার পর্যন্ত সড়কের ৩ কিলোমিটার পুনর্বাসন কাজ সম্পন্ন হয়েছে। শনিবার ২৩ মে সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘদিন অবহেলিত ও দুর্ভোগে থাকা পাহাড়ি এই সড়ক উন্নয়নের ফলে স্থানীয় মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বান্দরবানের বাস্তবায়নে ২ কোটি ৫১ লাখ টাকা ব্যয়ে এ কাজ শেষ করা হয়েছে।
প্রকল্পটির নাম “ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পল্লী সড়ক পুনর্বাসন প্রকল্প”। প্রকল্পের আওতায় দুর্গম এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কার ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে জনদুর্ভোগ কমিয়ে আনা হচ্ছে। উন্নত হচ্ছে সড়ক যোগাযোগ, বদলেছে পায়ে হেঁটে দুর্গম পথ পাড়ি দেয়ার সময়ের হিসেব-নিকেষ।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এক সময় এই সড়কটি ছিল কাঁচা ও চলাচলের অনুপযোগী।নতুন সড়ক চালু হওয়ায় তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। জরুরি চিকিৎসা, শিক্ষা কার্যক্রম, কৃষিপণ্য পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে এই সড়ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা জাকির বলেন, আগে এই সড়ক দিয়ে মূলত চাঁদের গাড়ি ও মোটরসাইকেল ছাড়া অন্য যানবাহন চলাচল প্রায় অসম্ভব ছিল। রাস্তার অবস্থা খারাপ থাকায় অনেক সময় প্রয়োজনীয় কাজেও মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভোগান্তি পোহাতে হতো। এখন রাস্তা উন্নয়ন হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে।আরেক স্থানীয় বাসিন্দা চিংমাই ম্রো জানান, সড়কটি পাকা হওয়ার ফলে এখন বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করছে। এতে স্থানীয় মানুষের সময় ও খরচ দুটোই কমেছে।
স্থানীয় এক সাবেক জনপ্রতিনিধি বলেন, এ সড়ক আমাদের স্বপ্ন বদলে দেবে। পাহাড়ের মানুষ এখন শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের আরও ভালো সুযোগ পাবে। শুধু পর্যটন নয়,এ সড়ক খুলে দিচ্ছে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কৃষি পণ্য পরিবহনের নতুন সুযোগও। আগে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলগুলো থেকে পণ্য আনা-নেওয়া ছিল কষ্টসাধ্য, এখন তা সহজেই সম্ভব হচ্ছে। এ বিষয়ে লামা উপজেলা প্রকৌশলী আবু হানিফ বলেন, দুর্গম এলাকার জনগণের জন্য নিরাপদ ও টেকসই যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সরকার ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে। ডলুছড়ি–লুলাইং সড়কের এই অংশের কাজ সম্পন্ন হওয়ায় এলাকার মানুষের চলাচল সহজ হয়েছে এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বান্দরবানের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রতিপদ দেওয়ান বলেন, পাহাড়ি এলাকায় সড়ক নির্মাণের ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। কৃষকরা এখন সহজে তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে পারছেন, ফলে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। এছাড়া দুর্গম এলাকার মানুষের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি পেয়েছে।
এলজিইডি টেকসই ও জনবান্ধব উন্নয়নের মাধ্যমে পাহাড়ি জনপদের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় ৩ কিলোমিটার সড়ক পুনর্বাসন কাজ শেষ হয়েছে। পাশাপাশি নতুন টেন্ডারের মাধ্যমে আরও ৯ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে।
অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন হলে পুরো এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আসবে এবং দুর্গম জনপদের মানুষের জীবনযাত্রার মান আরও উন্নত হবে। এবং আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, এই সড়ককে কেন্দ্র করে আশপাশের এলাকায় মুরুং, মারমা ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর বসবাস। দীর্ঘদিন ধরে তারা সীমিত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে নানা ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি ছিলেন। তবে সড়ক উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে বলে আশা করছেন।স্থানীয়দের মতে, পাহাড়ের দুর্গম এলাকায় সড়ক উন্নয়ন শুধু যোগাযোগ নয়, বরং উন্নয়ন ও জীবনমান পরিবর্তনের অন্যতম বড় ভিত্তি। ডলুছড়ি–লুলাইং সড়কের কাজ শেষ হলে এই অঞ্চলে উন্নয়নের গতি আরও ত্বরান্বিত হবে।
বাড়বে নিরাপত্তা, বছরজুড়েই পাহাড়ের দুর্গম লুলাইং এলাকার মানুষকে জিম্মি করে চলে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও নির্যাতন। দুর্গমতার কারণে সেখানকার সাধারণ মানুষ এসব অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে সাহস করে না। এ সড়কটি সম্পূর্ণ নির্মাণ হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত টহল ও যাতায়াতে স্থানীয়দের সাহস ও আস্থা বাড়বে। তারা সহজেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নিতে পারবে। চাঁদাবাজি, অপহরণ, নির্যাতন, সন্ত্রাসী কার্যক্রম কমে আসবে। ফলে স্থানীয় জনগণের জীবনের নিরাপত্তাও বহুগুণে বেড়ে যাবে বলে জানান তিনি।
কালের সমাজ/কে.পি

