ঢাকা বুধবার, ২০ মে, ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ভোলার মেঘনা ও তেতুলিয়া যেন ‍‍`বালু খেকোদের‍‍` স্বর্গরাজ্য

জেলা প্রতিনিধি,ভোলা | মে ১৯, ২০২৬, ০৭:৪২ পিএম ভোলার মেঘনা ও তেতুলিয়া যেন ‍‍`বালু খেকোদের‍‍` স্বর্গরাজ্য

চারিদিকে মেঘনা, ইলিশা, তেতুলিয়া আর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর-জলবেষ্টিত এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময় দ্বীপ জেলা ভোলার অস্তিত্ব এখন চরম সংকটে পড়েছে। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তীব্র নদী ভাঙন, অন্যদিকে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ড্রেজার দিয়ে নির্বিচারে অবৈধ বালু উত্তোলন-এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে ভোলার মানচিত্র।

ইতিমধ্যেই জেলার একটি বৃহৎ অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে হাজারো পরিবার, বিলুপ্ত হয়েছে ভোলার প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী বহু নিদর্শন, হাট-বাজার ও জনবহুল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ভোলাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি-অবিলম্বে নদী ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে ভোলা ও ভোলাবাসীকে বাঁচানো হোক।

কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং ‍‍`বালু খেকো‍‍` সিন্ডিকেটের দাপটে সেই দাবি কেবলই অরণ্যে রোদন। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ জনগণের দাবির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে সভা-সেমিনারে জোড়ালো ভূমিকা রাখার কথা ব্যক্ত করলেও বাস্তবে দেখা যায় তার উল্টো চিত্র। তাদের ছত্রছায়াতেই যেন নদী ভাঙনের এই মহাযজ্ঞের উৎসব চলছে। মেঘনা ও তেতুলিয়া নদী ঘিরে গড়ে ওঠা এসব চরাঞ্চল শুধু কৃষির জন্যই নয়, স্থানীয় অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ কিছু অসাধু বালু খেকো চক্রের লোভের আগুনে আজ তা ধ্বংসের মুখে পড়েছে।

স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, প্রতিটি সরকারের আমলেই রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতা, তাদের আত্মীয় বা ঘনিষ্ঠ কর্মীদের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে নদীর তীর ঘেঁষে চলে বালু উত্তোলনের প্রতিযোগিতা। কেউ এর প্রতিবাদ করলে জোটে মামলা, হামলা ও নানামুখী হয়রানি। এমনকি এই অবৈধ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে সত্য তুলে ধরতে গিয়ে একাধিক সাংবাদিক রাজনৈতিক রোষানলের শিকার হয়েছেন।

ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর ক্ষমতার হাতবদল ও চেহারার পরিবর্তন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মেঘনা-তেতুলিয়ার বুক চিরে বালু উত্তোলনের মহোৎসব থামেনি; শুধু বদলেছে বালু খেকো সিন্ডিকেটের পেছনের গডফাদারদের নাম।

সরেজমিনে ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার তেতুলিয়া নদীতে গিয়ে দেখা যায় এক ভয়ানক চিত্র। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে দিন-রাত অবিরাম চলছে শক্তিশালী ৯টি ড্রেজার মেশিন। নদীর তলদেশ থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলার কারণে নদীর স্বাভাবিক স্রোত ব্যাহত হচ্ছে এবং তলদেশে সৃষ্টি হচ্ছে বিশালাকার বিপজ্জনক খাদ।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে নদী তীরবর্তী চরাঞ্চলে। হঠাৎ করেই বোরহানউদ্দিনের চর লতিফ ও চর বাগমারা এলাকার আবাদি জমিতে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে নদীগর্ভে চলে গেছে শত শত একর তিন ফসলি কৃষিজমি এবং ভাঙন আতঙ্কে ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন হাজারো কৃষক পরিবার।

স্থানীয় কৃষক আব্দুল মালেক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "একদিকে নদী ভাঙছে, অন্যদিকে চোখের সামনে ড্রেজারে বালু তুলতাছে।

এদের বন্ধ করার কেউ নাই। আমরা যামু কই?" একই চিত্র ভোলার সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়ন সংলগ্ন মেঘনা নদীতেও। সেখানেও দীর্ঘদিন ধরে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলন।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে, গত কয়েক বছরে এই অবৈধ বালু বাণিজ্যের কারণে কাচিয়া ইউনিয়নের ‍‍`মাঝের চর‍‍`-এর প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার পরিবার তাদের শেষ সম্বল বসতভিটা হারিয়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছে। এছাড়া বালু উত্তোলন কে কেন্দ্র আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিবাদ হয়েছে একাধিকবার।

এই অবৈধ ড্রেজার মেশিনে বালু উত্তোলন কার্যক্রম দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করলেও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ভোলা কোস্ট গার্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে লোকদেখানো বা নামমাত্র অভিযান চালানো হলেও তা কোনো স্থায়ী সমাধান আনছে না, যা সচেতন মহলকে ক্ষুব্ধ করেছে।

বোরহানউদ্দিন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রনজিৎ চন্দ্র দাস স্থানীয় পুলিশের সহায়তায় একাধিকবার ড্রেজার মেশিন জব্দ এবং জরিমানা করলেও প্রশাসনের লোক চলে যাওয়ার পরপরই আবারও চালু হয় বালু উত্তোলন।

নামমাত্র জরিমানা করে এই বিশাল অবৈধ কোটি টাকার বাণিজ্য বন্ধ করা সম্ভব না হওয়ায় বালু খেকোরা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। স্থানীয়দের দাবি, অবিলম্বে ড্রেজার কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করে নদী রক্ষা এবং চরাঞ্চলের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

আমরা ভোলাবাসী সংগঠনের সদস্য সচিব মীর মোশারেফ হোসেন অমি বলেন-ভোলায় মেঘনা ও তেতুলিয়া নদীতে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ বন্ধ নয়, বরং নিয়মতান্ত্রিক ও পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করা প্রয়োজন। কারণ সঠিক ব্যবস্থাপনায় বালু উত্তোলন স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও উন্নয়ন কার্যক্রমে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন সাময়িক লাভ দিলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি নদীভাঙন, পরিবেশ ধ্বংস, কৃষিজমির ক্ষতি এবং সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকায় মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কঠোর নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা জরুরি।

সুশাসনের জন্য নাগরিক ভোলা জেলা কমিটির সভাপতি মোবাশ্বির উল্লাহ চৌধুরী বলেন-প্রশাসনের অবহেলা,অনিয়মকে দায়ী করেন। আর যে অভিযান পরিচালনা করেন তা হচ্ছে লোক দেখানো অভিযানকে ।

তিনি ও আরো ও বলেন- একজন বালু খেকোর ৫ থেকে ১০টি ড্রেজার রয়েছে। নামমাত্র অভিযানে একটি ড্রেজার আটক করে কিছু জরিমানা করে ছেড়ে দেয়। একজন বালু খেকো সাপ্তাহের ৬দিন নির্ভয়ে বালু উত্তোলন করে। আর প্রশাসন ১ দিন অভিযান করে। ফলে বালু উত্তোলন কারীরা নির্বিঘ্নে ব্যবসা করে। নদী বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে পরিকল্পিত ভাবে বালু উত্তোলন না করলে ভোলা জেলাটি বিলীন হয়ে যাবে।

এবিষয়ে কথা হয় ভোলার জেলা প্রশাসক ডাঃ শামিম রহমান তিনি বলেন-জল মহল ইজারার বাহিরে কিছু অবৈধ ব্যবসায়ী বালু উত্তোলন করে যা জেলার জন্য হুমকি স্বরুপ। যেখানে অবৈধ বালু উত্তোলন হয় সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথেই অভিযান পরিচালনা করা হয়। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। তিনি চরে বসবাস রত বাসিন্দা সহ সচেতন নাগরিকদের এগিয়ে আসা এবং অবৈধ বালু উত্তোলন কারীদের তথ্য দিয়ে সহযোগীতা করার আহব্বান জানান।

নদী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন কেবল তাৎক্ষণিক ভাঙনই বাড়ায় না, এটি নদীর স্বাভাবিক গতি ও পরিবেশগত ভারসাম্য সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। একই সাথে নদীর মৎস্য সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে। তারা দ্রুত মনিটরিং জোরদার করা, কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং এ বিষয়ে ভোলা কোস্ট গার্ডের কঠোর দৃষ্টি ও স্থায়ী নজরদারি কামনা করছেন।

মেঘনা ও তেতুলিয়া নদী দিয়ে ঘিরে থাকা ভোলার এই চরাঞ্চলগুলো রক্ষা করা না গেলে এবং এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে অচিরেই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে ভোলার একাধিক ইউনিয়ন ও চর। আর এভাবে চলতে থাকলে একদিন হয়তো বাংলাদেশের মানচিত্র থেকেই এই সম্ভাবনাময় ‍‍`ভোলা‍‍` জেলার নামটি মুছে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। ভোলাবাসীকে বাঁচাতে প্রশাসন ও সরকারের শীর্ষ মহলের অতি দ্রুত ও কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করছে ভোলার সর্বস্তরের জনগণ।

কালের সমাজ/কে.পি

Link copied!