‘সোনালী আঁশে ভরপুর, ভালোবাসি ফরিদপুর’— স্লোগানটি জেলার ব্র্যান্ডিং হলেও চলতি মৌসুমে ফরিদপুরের পাট চাষীদের মুখে হাসির বদলে এখন দুশ্চিন্তার কালো মেঘ। দেশের বৃহত্তম ও গুণগত মানে বিশ্বসেরা পাট উৎপাদনকারী এই জেলায় মৌসুমের শুরুতে তীব্র ডিজেল সংকটের কারণে ব্যাহত হয়েছে সেচ কার্যক্রম। ফলে বীজের অঙ্কুরোদগম আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় এবার বড় ধরনের ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন প্রান্তিক কৃষকরা।
সাধারণত মার্চের শেষ থেকে এপ্রিলের শুরুতে পাটের বীজ বপন করা হয়। এ বছর বপন পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়ে স্থানীয় বাজারেও। কৃষকদের অভিযোগ, বীজ বোনার পর যে পরিমাণ সেচের প্রয়োজন ছিল, ডিজেলের অভাবে তা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সেচ বঞ্চিত অনেক জমিতে মাত্র ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ চারা গজিয়েছে। কৃষকরা বলছেন, যারা কষ্ট করে ডিজেল সংগ্রহ করে সেচ দিতে পেরেছেন, তাদের জমিতে ফলন স্বাভাবিক থাকলেও অধিকাংশ মাঠই এখন চারাশূন্য বা পাতলা হয়ে আছে। গত মৌসুমে বিঘাপ্রতি ৬ থেকে ১০ মণ ফলন হলেও এবার তা ২ থেকে ৫ মণে নেমে আসার উপক্রম হয়েছে।
সরকারিভাবে ডিজেল কার্ড দেওয়া হলেও পাম্পগুলোতে দিনের পর দিন ঘুরেও তেল পাওয়া যায়নি। সদরের এক চাষী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "কার্ড নিয়ে বারবার ঘুরেও তেল পাইনি। পানির অভাবে বীজ মাটিতেই শুকিয়ে গেছে। এখন বৃষ্টি হয়ে কী লাভ? চারা তো আর গজাল না।"
দ্বিমত পোষণ করছে কৃষি বিভাগ
তবে মাঠ পর্যায়ের এই হাহাকারের সাথে একমত নন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। উপ-পরিচালক মো. শাহাদুজ্জামান দাবি করেন, "মৌসুমের শুরুতেই কার্ডের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ করা হয়েছে। তাছাড়া পরবর্তীতে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হওয়ায় সেচের অভাবে ক্ষতি হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।" চারা কম গজানো প্রসঙ্গে তিনি আরও যোগ করেন, চাষীরা সাধারণত ঘন চারা তুলে ফেলেন (পাতলাকরণ), তাই শুরুতে চারা কিছুটা কম হলেও চূড়ান্ত ফলনে তার বড় কোনো প্রভাব পড়বে না।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ফরিদপুরে পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৭ হাজার ৩২৮ হেক্টর জমি। বিপরীতে আবাদ হয়েছে ৮৭ হাজার ৪০২ হেক্টর জমিতে। জেলা থেকে এবার ১ লক্ষ ৯৫ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কাগজে-কলমে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেলেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সময়মতো সরকারি সহযোগিতা ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে ফরিদপুরের পাটের যে ঐতিহ্য ও চাহিদা রয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
কালের সমাজ/কে.পি

