ঢাকা রবিবার, ১০ মে, ২০২৬, ২৭ বৈশাখ ১৪৩৩

‎ঈশ্বরগঞ্জে ইএনওর ক্ষমতার অপব্যবহার, কবরস্থান ভেঙ্গে আইসিটি ভবন নির্মাণ,আদালতের নিষেধাজ্ঞা জারি।

জেলা প্রতিনিধি,ময়মনসিংহ | মে ১০, ২০২৬, ০৮:০৮ পিএম ‎ঈশ্বরগঞ্জে ইএনওর ক্ষমতার অপব্যবহার, কবরস্থান ভেঙ্গে আইসিটি ভবন নির্মাণ,আদালতের নিষেধাজ্ঞা জারি।

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা-এ আদালতে বিচারাধীন একটি নালিশি জমিতে পারিবারিক কবরস্থান ভেঙে আইসিটি ভবন নির্মাণকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আদালতের আদেশ অমান্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে উপজেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে।

‎অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সানজিদা রহমান, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি), মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সাইট ইঞ্জিনিয়ারসহ কয়েকজন কর্মকর্তা।
‎এ ঘটনায় প্রথম পক্ষ হিসেবে স্থানীয় বাসিন্দা মকবুল হোসেন ও তার পরিবারের সদস্যরা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। অপরদিকে দ্বিতীয় পক্ষ হিসেবে রয়েছে উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ। আদালতে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় কবরস্থান ভেঙে ভবন নির্মাণের অভিযোগে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

‎মামলার নথি ও ভুক্তভোগীদের সূত্রে জানা যায়, ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চত্বরে আইসিটি ভবন নির্মাণকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। বাদীপক্ষের দাবি, যে জমিতে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে সেটি তাদের বংশানুক্রমিক মালিকানাধীন সম্পত্তি এবং সেখানে তাদের পারিবারিক কবরস্থান রয়েছে। অথচ প্রশাসন কোনো ধরনের ভূমি অধিগ্রহণ বা আইনগত নিষ্পত্তি ছাড়াই জোরপূর্বক ওই জমিতে নির্মাণকাজ শুরু করে।

‎বাদীপক্ষের অভিযোগ, ইউএনও সানজিদা রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মামলাধীন জমির কাগজপত্র যথাযথভাবে যাচাই না করেই নির্মাণকাজ এগিয়ে নিতে থাকেন। একপর্যায়ে পারিবারিক কবরস্থানের মাঝখানে ভবনের পিলার স্থাপন করা হলে স্থানীয়রা বাধা দেন। এ সময় প্রশাসনের সঙ্গে বাদীপক্ষের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

‎অভিযোগ রয়েছে, নির্মাণকাজে বাধা দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইউএনও ক্ষিপ্ত হয়ে বাদীপক্ষকে দমন করতে মিথ্যা মামলা দায়েরের পথ বেছে নেন। এ ঘটনায় দুই নারীকে গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে বলেও দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।
‎গ্রেফতার হওয়া দুই নারী অভিযোগ করেন, তাদের সঙ্গে অসদাচরণ করা হয়েছে এবং শারীরিকভাবেও লাঞ্ছিত করা হয়েছে। পরে তারা আদালত থেকে জামিনে বের হন।

‎প্রশাসনের ভয়ভীতি ও গ্রেফতার আতঙ্কের মধ্যেই কবরস্থান ভেঙে আইসিটি ভবনের নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়া হয়। পরে কোনো উপায়ান্তর না পেয়ে তারা ঈশ্বরগঞ্জ সিনিয়র সহকারী জজ আদালত-এ অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন করেন।

‎আদালতের নথি অনুযায়ী, দেওয়ানী কার্যবিধির ৩৯ আদেশের ১/২ নং বিধির আওতায় দায়ের করা আবেদনের শুনানি শেষে আদালত নালিশি জমিতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার নির্দেশ দেন। আদালত আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, আপত্তি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নালিশি জমির আকার-আকৃতি পরিবর্তন করা, কোনো স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ সহ পারিবারিক কবরস্থান উচ্ছেদ করা যাবে না।
‎আদেশে আরও বলা হয়, বাদীপক্ষের শান্তিপূর্ণ ভোগদখলে কোনো ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করা যাবে না।

‎তবে বাদীপক্ষের অভিযোগ, আদালতের নিষেধাজ্ঞা জারির পরও ইউএনও সানজিদা রহমান-এর নেতৃত্বে প্রায় ৫৯ মিনিট নির্মাণকাজ চালানো হয়। পরে থানা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে কাজ বন্ধ করা হয়। আদালতের আদেশ অমান্যের এমন অভিযোগে এলাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

‎এদিকে মামলার অপর এক আদেশে আদালত আমিন কমিশনার নিয়োগ দিয়ে সরকারি সার্ভেয়ারসহ সরেজমিনে জমি পরিমাপের নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে আদালত জানতে চান, অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারির পর নালিশি জমির কোনো পরিবর্তন করা হয়েছে কিনা। এজন্য স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাক্ষ্য গ্রহণ, স্থিরচিত্র ও স্কেচম্যাপ দাখিলেরও নির্দেশ দেওয়া হয়।

‎অন্যদিকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দায়ের করা একটি মামলায় দাবি করা হয়েছে, সরকারি জায়গায় আইসিটি ভবন নির্মাণে বাধা দিয়ে হামলা, মারধর ও নির্মাণসামগ্রী চুরির ঘটনা ঘটানো হয়েছে। মামলায় মকবুল হোসেন, মাসুদ, মামুন ও রাসেলসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

‎তবে এ মামলাকে  সাজানো ও হয়রানিমূলক দাবি করেছেন বাদীপক্ষ। তাদের অভিযোগ, প্রকৃতপক্ষে কোনো চুরি বা হামলার ঘটনা ঘটেনি। এমনকি ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন নির্মাণশ্রমিকও অনানুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন, তাদের কোনো মালামাল চুরি হয়নি এবং তাদের মারধরও করা হয়নি। ফলে মামলার সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

‎এ ঘটনায় আরেকটি অভিযোগ সামনে এসেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে। ভুক্তভোগী রাসেল নামে এক ব্যক্তি উপজেলা নির্বাহী অফিসে নাইট গার্ড হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি পারিবারিক কবরস্থানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। বর্তমানে রাসেল ও তার পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছেন বলেও জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারের লোকজন।

‎নালিশি ভূমির দাবিদার মকবুল হোসেন ও তার পরিবারের অন্যান্য ওয়ারিশানগণ জানান, পূর্ববর্তী জেলা প্রশাসক, ইউএনও ও ভূমি কর্মকর্তারা বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দিয়েছিলেন। তারা বলেছিলেন, জমি প্রকৃত মালিকদের বুঝিয়ে দেওয়া হবে অথবা প্রয়োজন হলে আইনগতভাবে অধিগ্রহণ করা হবে। কিন্তু বর্তমান প্রশাসন কোনো সমাধানে না গিয়ে উল্টো শক্তি প্রয়োগ করে নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

‎এদিকে আদালতের নির্দেশ অমান্য, কবরস্থান উচ্ছেদের অভিযোগ, নারী গ্রেফতার, চাকরিচ্যুতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনায় ঈশ্বরগঞ্জজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন হওয়া জরুরি।

‎উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা রহমান বলেন, “কবরস্থান ভাঙার কোনো ঘটনা ঘটেনি। কবরস্থানের সীমানা ও পুরোনো কবরগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করেই আইসিটি ভবনের নির্মাণকাজ পরিচালনা করা হচ্ছে। সরকারি উন্নয়নমূলক এই কাজ বাস্তবায়নে প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে। তবে উন্নয়নকাজে কেউ অযথা বাধা সৃষ্টি করলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

কালের সমাজ/কে.পি

Link copied!