ঢাকা সোমবার, ০৪ মে, ২০২৬, ২১ বৈশাখ ১৪৩৩
নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাটারি চালিত রিক্সা

বিদ্যুৎ ও সড়ক ব্যবস্থার জন্য এক ‘অদৃশ্য ঘাতক’

মোহাম্মদ আলী সুমন | মে ৪, ২০২৬, ০১:২৫ পিএম বিদ্যুৎ ও সড়ক ব্যবস্থার জন্য এক ‘অদৃশ্য ঘাতক’

দেশের বিদ্যুৎ খাত বর্তমানে এক বহুমুখী সংকটে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে। একদিকে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, অন্যদিকে বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা আর লোডশেডিংয়ে জনজীবন ও শিল্পোৎপাদন বিপর্যস্ত। এই মহাসংকটের মাঝেই ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে আবির্ভূত হয়েছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। একসময় প্রান্তিক মানুষের স্বল্পব্যয়ের বাহন হিসেবে জনপ্রিয়তা পেলেও, বর্তমানে এটি জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য এক অদৃশ্য ‘লোড-দানব’ এবং সড়ক নিরাপত্তার জন্য এক ভয়ংকর হুমকিতে পরিণত হয়েছে।

বিভিন্ন গণমাধ্যম ও বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ৪০ থেকে ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজি-বাইক চলাচল করছে। যদিও বিআরটিএ-র কাছে এর কোনো নির্ভুল পরিসংখ্যান নেই। প্রতিটি রিকশা দৈনিক গড়ে ৫ থেকে ৬ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ করলে, এই বিশাল বহরের জন্য দৈনিক চাহিদ দাঁড়ায় কয়েক হাজার মেগাওয়াটে। উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রতিদিন প্রায় ২,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ স্রেফ ‘উধাও’ হয়ে যাচ্ছে, যার সিংহভাগই খরচ হচ্ছে এসব যানের চার্জিংয়ে। এটি শুধু বিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত চাপ নয়, বরং সরাসরি রাষ্ট্রীয় রাজস্বের এক বিশাল ছিদ্রপথ। কারণ, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ চার্জিং পয়েন্টই অবৈধ। এসব অননুমোদিত গ্যারেজে কোনো মিটার ছাড়াই হুকিং বা অসাধু উপায়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে, যার ফলে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে এবং বৈধ গ্রাহকদের ওপর বাড়ছে লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা।

বিদ্যুতের এই অপচয়ের সমান্তরালে গড়ে উঠেছে এক নিয়ন্ত্রণহীন ও অনিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা। যেখানে দেশে নিবন্ধিত মোট যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৬২ লাখ, সেখানে তার প্রায় সমান সংখ্যক অবৈধ তিন চাকার যান সড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এটি স্পষ্টতই একটি ‘সমান্তরাল অবৈধ পরিবহন ব্যবস্থা’, যার কোনো কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ, লাইসেন্সিং বা কারিগরি মানদণ্ড নেই। জেলা-উপজেলায় গড়ে ওঠা কয়েক হাজার ছোট ছোট কারখানায় কোনো প্রকার প্রকৌশলগত জ্ঞান ছাড়াই তৈরি হচ্ছে এসব রিকশা। নিম্নমানের লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি এবং দুর্বল ব্রেকিং সিস্টেমের এই যানগুলো যখন মহাসড়কে দ্রুতগতির বাস-ট্রাকের সঙ্গে পাল্লা দেয়, তখন সড়ক হয়ে ওঠে মৃত্যুফাঁদ। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আজ এই ছোট যানের ভিড়ে পঙ্গু হতে বসেছে, যার ফলে কমছে গড় গতি এবং বাড়ছে অসহনীয় যানজট।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল একটি শৃঙ্খলার অভাব নয়-এটি দীর্ঘদিনের ‘নীতিগত ব্যর্থতা’। অধ্যাপক মো. হাদীউজ্জামানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই খাতটি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে একে চাইলেই আর উপেক্ষা করার উপায় নেই। কোটি মানুষের জীবিকা এখানে জড়িত থাকলেও, একে অনিয়ন্ত্রিত রাখার মাশুল দিচ্ছে পুরো রাষ্ট্র। এই সংকট নিরসনে সরকারকে খণ্ডিত অভিযানের পথে না হেঁটে একটি সমন্বিত এবং বাস্তবসম্মত নীতিমালায় আসতে হবে। প্রথমত, ব্যাটারি রিকশাকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার অবাস্তব চিন্তা বাদ দিয়ে একে নিবন্ধনের আওতায় এনে একটি স্বচ্ছ ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে। প্রতিটি রিকশার জন্য ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও চালকের জন্য লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা এখন সময়ের দাবি।

দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ চুরি ঠেকাতে অবিলম্বে নির্ধারিত এলাকায় বৈধ চার্জিং স্টেশন স্থাপন করতে হবে। আলাদা বিদ্যুৎ ট্যারিফ নির্ধারণ করে স্মার্ট প্রিপেইড মিটারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করলে রাজস্ব ক্ষতি যেমন কমবে, তেমনি জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপও সুশৃঙ্খল হবে। পাশাপাশি, শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে রিকশা উৎপাদনকারী কারখানাগুলোতে মান নিয়ন্ত্রণ বা স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন নিশ্চিত করতে হবে। উন্নত মানের লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ব্যবহারে উৎসাহিত করা গেলে বিদ্যুতের ব্যবহার যেমন কমবে, তেমনি পরিবেশগত ঝুঁকিও হ্রাস পাবে।

এমতাবস্থায় জাতীয় সার্থ রক্ষায়, সড়ক নিরাপত্তার স্বার্থে মহাসড়ক ও প্রধান ধমনীগুলোতে এসব যানের চলাচল কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে বিকল্প রুট নির্ধারণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, ব্যাটারি রিকশা আজ একই সাথে দরিদ্র মানুষের অর্থনীতির চাকা এবং রাষ্ট্রের জন্য এক নীরব সংকট। এই দ্বৈত বাস্তবতার মাঝেই প্রয়োজন কঠোর এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিনির্ধারণ। আজ যদি এই ‘ক্ষুদ্র যান’-এর লাগাম টেনে ধরে একে শৃঙ্খলার আওতায় আনা না যায়, তবে ভবিষ্যতে এটিই জাতীয় বিদ্যুৎ নিরাপত্তা ও সড়ক ব্যবস্থার জন্য এক অপূরণীয় বিপর্যয় ডেকে আনবে।

লেখক: সাংবাদিক ও সংগঠক।

কালের সমাজ/এসআর

Link copied!