বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই সবার আগে সামনে আসছে বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন এবং জেন-জি, জেন-আলফা শিক্ষার্থীদের নানান ভিডিও। জন্ম দশক হিসেবে বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী জেন-জোন্স (১৯৫৪ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণ করলে তাদেরকে বলা হয় জেন-জোন্স বা জেনারেশন জোন্স) এর আওতাভুক্ত বা অন্তর্গত। জেন-জোন্স অ্যানালগ বিশ্বে বেড়ে ওঠা শেষ প্রজন্ম এবং প্রথম কর্মজীবী প্রজন্ম যারা ডিজিটাল প্রযুক্তি গ্রহণ করেছে। তবে এরা কর্মক্ষেত্রে বা জীবনে যেকোনো পরিস্থিতিতে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পটু। এরা শৈশবে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি পেলেও, তরুণ বয়সে অর্থনৈতিক মন্দা ও সুযোগের অভাবে এদের মধ্যে একটি নিরাশাবাদী দৃষ্টি তৈরি হয়েছিলো। এরা স্বাধীনতার বিষয়ে খুব জেদি এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার জন্য কঠোর পরিশ্রমী, এরা বয়স্ক পিতামাতা এবং তরুন সন্তান-উভয়ের দায়িত্ব একসাথে পালন করায় প্রবল মানসিক চাপে থাকে, আগের এবং পরের দুই জেনারেশনের আধিপত্যতায় এই প্রজন্মের আলাদা পরিচয় অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়, তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই প্রজন্ম বাস্তবতার কষাঘাতে জর্জরিত হয়েও টিকে থাকার লড়াইয়ে দক্ষ এবং জীবন সম্পর্কে খুব বাস্তববাদী।
অন্যদিকে, বর্তমানে শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ হচ্ছে জেন-জি (১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণ করলে তাদেরকে জেন-জি বা জেনারেশন জেড হিসাবে গণ্য করা হয়)। এই এই প্রজন্ম ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া এবং উন্নত প্রযুক্তির সাথে বেড়ে উঠেছে। সামাজিক ন্যায়বিচার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সমতার বিষয়ে তারা অত্যন্ত সচেতন। একই সাথে তারা নতুন ধারণা, সৃজনশীলতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে তারা পারদর্শী। এদেরকে জেন-জি এর পাশাপাশি জুমার আই জেনারেশন বা নেই জেন নামেও ডাকা হয়, প্রযুক্তির আশীর্বাদে দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়া ও নতুনত্ব তৈরি করাই এই প্রজন্মের মূল পরিচয় বা লক্ষ্য।
জেন-জি প্রজন্মের পরের বর্তমান প্রজন্মের নাম হচ্ছে জেন আলফা (২০১৩ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে যাদের জন্ম তাদেরকে জেন-আলফা বা জেনারেশন আলফা বলে ধরা হয়ে থাকে)।
সর্বশেষ প্রজন্মের নাম হচ্ছে জেন-বিটা (২০২৫ সাল থেকে ২০৩৯ সালের মধ্যে যাদের জন হবে, তাদেরকে জেন-বিটা বা জেনারেশন বিটা বলে গণ্য করা হচ্ছে বা হবে)।
জেন-জোন্স আ ন ম এহসানুল হক মিলন স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের একজন আলোচিত-সমালোচিত এবং বহুল চর্চিত শিক্ষামন্ত্রী। তিনি ১৯৯১ সালে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর তৎকালীন দুই প্রজন্ম জেন-এক্স (১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে যাদের জন্ম তাদেরকে জেন-এক্স বা জেনারেশন এক্স বলে ধরা হয়ে থাকে) এবং জেন-ওয়াই (১৯৮১ সাল থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে যাদের জন্ম তাদেরকে জেন-আলফা বা জেনারেশন আলফা বলে ধরা হয়ে থাকে) এর ঘুম কেড়ে নিয়েছিলেন। তখন বাচ্চাদের ঘুম পাড়ানোর জন্য “খুকু ঘুমালো, পাড়া জোড়ালো, বর্গি এলো দেশে” গান গেয়ে ঘুম পাড়ানোর পাশাপশি শিক্ষার্থীদেরকে “হেলিকপ্টার মিলন আসবে পরীক্ষার হলে” বলে ভয় দেখিয়ে পড়ার টেবিলে বসানো হতো। আ ন ম এহসানুল হক মিলন তার পারিবারিক বা কেতাবি নাম হলেও তিনি জনগণের কাছ থেকে খেতাব পেয়েছিলেন “হেলিকপ্টার মিলন” হিসেবে। দেশে বিদেশে উচ্চশিক্ষা শেষে তিনি থিতু হয়েছিলেন সুদুর আমেরিকা। পুরোদস্তুর সুটেট-বুটেট হয়ে তিনি হেলিকপ্টারে করে সারা বাংলাদেশের পরীক্ষা কেন্দ্রে না বলে হুট-হাট করে হাজির হয়ে নকল করার দায়ে অনেক শিক্ষার্থী এবং নকলে সহযোগীতা বা পরীক্ষা সংক্রান্ত কাজে অনিয়মের অভিযোগে অনেক শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন। তিনি তখন নকলবাজ শিক্ষার্থীদের কাছে এক মূর্তিমান আত্মঙ্ক হয়ে উঠেছিলেন। তিনিই হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিক্ষামন্ত্রীদের একজন।
আ ন ম এহসানুল হক মিলনের মন্ত্রীত্ব শেষ হওয়ার পর বুুড়িগঙ্গা, নবগঙ্গা, পদ্মা, মেঘনা, যমুনায় অনেক পানি গড়িয়েছে। নদীর বুকে বালুর চর জেগেছে। গ্রামে কুপির বাতির বদলে বৈদ্যুতিক লাইট জ¦লা শুরু হয়েছে। জেন-জি’র আগমন ঘটেছে। ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদের নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর অধিকাংশ জনগণের প্রত্যাশা ছিলো বিগত সময়ের ভেঙ্গেপড়া বা ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর জন্য শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দরকার সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলনকে। জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি শপথ পড়তে যাওয়ার দিন মহান জাতীয় সংসদের গেটে লাফ দিয়ে দড়ি পার হতে দেখে অনেকেই ভাবছিলেন বাংলাদেশের ফাটাকেষ্ট আগের মতোই এনার্জিটিক আছেন, বয়স তার কাছে একটা সংখ্যামাত্র। নতুন সরকার গঠন হলে তিনি প্রত্যাশিত শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পেলে জেন-এক্স এবং জেন-আলফারা সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখতে শুরু করলো আমরা আ ন ম এহসানুল হক মিলন বা হেলিকপ্টার মিলনের সময়ে এসএসসি বা এইচএসসি পাশ, যা এযুগের ডক্টরেট ডিগ্রীর সময়, কেউবা জেন-জি আর জেন-আলফাকে সর্তক করে লিখলেন বাচ্চারা এবার মোবাইল ছেড়ে পড়ার টেবিলে যাও। জেন-এক্স এবং জেন-আলফার বাবা মায়েরা তাদের সন্তানকে আ ন ম এহসানুল হক মিলনের কীর্তিকাথা শুনাতে লাগলেন। আতংকের হাইফে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ার পাশাপাশি অনেকে লেখাপড়া ছেড়ে মাঠে হাটে বা বিদেশে পাড়ি জমালেন। টেলিভিশন এবং পত্রিকান্তে জানাগেলো বরিশালের একটা কলেজের ঊনসত্তর জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে না, কারন তারা নাকি আ ন ম এহসানুল হক মিলন এর যুগে নকলের সুযোগ পাবে না।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন নকলের বিরুদ্ধে হাইফ তুলতে পারলেও, বিগত কয়েকদিন যাবত সোশ্যাল মিডিয়ায় তার কিছু কর্মকান্ড এবং বক্তব্য ভাইরাল হওয়ায়। তিনি নেমে গেলেন অন্য আর পাঁচজন সাধারণ মন্ত্রীদের কাতারে। অভিভাবকরা আলোচনা সমালোচনা শুরু করলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাকে ভয় পাওয়ার বদলে ট্রল করা শুরু করলেন, কেউ কেউ তো সোশ্যাল মিডিয়ায় কাল বৈশাখী ঝড় তুলে ফেলছেন, কেউ কেউ তার নাম বিকৃতি করে হাস্যরসের মাধ্যমে হেয় প্রতিপন্ন করছে। জেন-জি প্রতিনিধি হিসেবে শুধুমাত্র এসএসসি/দাখিল বা এইচএসসি/আলিম না, বয়সে নবীণ প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা, যাদেরকে জেনারেশন আলফা বা জেন-আলফা বলে ডাকা হয়, তারাও গণমাধ্যম আর সোশ্যাল মিডিয়ায় যা ইচ্ছে বলে যাচ্ছে, এই প্রজন্মদেরকে এখনি বোঝানো উচিৎ রাষ্ট্রের একজন দায়িত¦প্রাপ্ত বা দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের পক্ষে বা বিপক্ষে, গণমাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়ায় কথা বলার মতো বয়স তোমাদের হয়নি। অভিভাবক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি সবাইকে এবিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে। কিছু অসাধু ভিউ ব্যবসায়ীরা কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরকে যেমন উস্কে দিচ্ছেন, তেমনিভাবে অনেক রাজনৈতিক দলও তাদেরকে ব্যবহার করছেন, কোমলমতি শিক্ষার্থীরা না বুঝে, না জেনে সেই ফাঁদে পা দিয়ে নিজের প্রজন্মের সর্বনাশ ডেকে আনছে। বন্ধু বান্ধব থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদেরকে নিয়েও সোশ্যাল মিডিয়ায় চলছে নানা তৎপরতা এবং অপতৎপরতা।
আগামীর সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে জেন-জি, জেন-আলফা, জেন-জোন্সসহ সকল প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে। কেউ কারো প্রতিপক্ষ না হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, হাতে হাত রেখে এগিয়ে যেতে হবে, জেন-জোন্সের অভিজ্ঞতা, দূরদর্শীতা কাজে লাগিয়ে জেন-জি এর কলাকৌশকে সঠিক ব্যবহার করে জেন-আলফার জন্য সুন্দর বাংলাদেশ গড়ায় সকলের অংশগ্রহণ করতে হবে।
লেখক : ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
কালের সমাজ/এসআর

