সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দীর্ঘ তিন যুগ পর আগামী ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আন্দোলন-লড়াই-সংগ্রামের আতুরঘর খ্যাত ঐতিহাসিক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র ও হল সংসদ নির্বাচন। দীর্ঘ দেড়শত বছরের পথচলায় ব্রাক্ষ স্কুল থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে ওঠা ছাত্রনেতারা নেতৃত্ব দিয়েছেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, সেনাশাসন, স্বৈরশাসন, ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে। প্রতিটি আন্দোলনে ন্যায় আর শোষিতের পক্ষে লড়াই করে জীবন দিয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সে সকল লড়াই-সংগ্রামের স্মারক হিসেবে ক্যাম্পাসে গৌরবের সাথে দাঁড়িয়ে আছে ভাষা শহীদ রফিক ভবন, মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য, শহীদ সাজিদ ভবনসহ অনেক স্থাপনা। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদের নির্বাচিত এবং অংশগ্রহণকারী ছাত্রনেতারা একসময় ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে জায়গা করে নিয়েছেন জাতীয় রাজনীতিতে। দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে অনেকে হয়েছেন এমপি, মন্ত্রী। অনেকে আজীবন লড়ে গেছেন বা লড়ে যাচ্ছেন সত্য, ন্যায় আর শোষিতের পক্ষে। অগ্রজদের দেখানো পথে হাঁটছেন অনুজরা।
ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হয়ে উঠেছে উৎসবের লীলাভূমি। উৎসবের জোয়ারে ভাসছেন প্রার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সাধারণ শিক্ষার্থীদের বেড়েছে কদর, তাঁরা পাচ্ছেন আলাদা গুরুত্ব, কারণ তাঁরাই তো এই উৎসবের প্রাণভোমরা, তাদের দেওয়া মূল্যবান ভোটেই নির্বাচিত হবেন আগামীর জকসু নেতৃত্ব। নির্বাচনী উৎসবে সাবেক শিক্ষার্থীদের রয়েছে আলাদা নজর এবং ভালো লাগা, নিজেরা কখনও ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ না পেলেও অনুজ শিক্ষার্থীদের সুযোগ পাওয়ায় অনেকে খুশি হয়েছেন।
জকসু নির্বাচন সবকিছু ছাপিয়ে উৎসবে রূপ নেওয়ার অন্যতম আরেকটি কারণ অনেক শিক্ষার্থীর জীবনে এটি প্রথম ভোটাধিকার প্রয়োগ করার মাধ্যমে স্বাধীন মতামত প্রকাশের সুযোগ। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর কনভোকেশনের পর এটাই শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে আনন্দের বিষয়, কনভোকেশনে শিক্ষার্থীরা পেয়ে থাকে নিজের অর্জিত সার্টিফিকেট আর জকসু নির্বাচনে তাঁরা পাবেন নিজের স্বাধীন মতামত প্রয়োগের সুযোগ।
তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার মনে হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা এখন প্যানেলের নাম মুখস্থ করা নিয়ে ব্যস্ত। প্যানেলের নামগুলো অনেকটা বিসিএস পরীক্ষার এমসিকিউ প্রশ্নের মতো, অনেকটা কাছাকাছি উত্তর থাকায় পরীক্ষার্থী যেমন কনফিউজড হয়ে যায়, তেমনি জকসু প্যানেলের নাম নিয়ে তারা পড়েছেন মহাচিন্তায়। নামগুলো অনেকটাই কাছাকাছি—ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান, অদম্য জবিয়ান, ঐক্যবদ্ধ জবিয়ান ইত্যাদি।
তবে প্যানেলগুলোর নামের মধ্যেই ফুটে উঠেছে প্যানেল এবং প্রার্থীদের দূরদর্শিতা। একেকটা শব্দ সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাহস যোগাচ্ছে। ঐক্যবদ্ধ, নির্ভীক, অদম্য, জবিয়ান—এই শব্দগুলো সবাইকে জানিয়ে দিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্নে, শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তারা সবাই এক ও অভিন্ন, সবার আগে জবিয়ান।
আগামীর ক্যাম্পাসের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রার্থীরা চষে বেড়াচ্ছেন কলা ভবনের কাঁঠালতলা থেকে বিজ্ঞান ভবনের ইট-সিমেন্টের চত্বরে, মেস থেকে ছাত্রী হলের গেটে, ছাত্রকল্যাণের নেতা থেকে এলাকার বড় ভাইয়ের কাছে, রাজনৈতিক বড় ভাই থেকে শুরু করে নিরীহ গোবেচারা শিক্ষার্থীদের কাছে। অলস সময়ে বাসা বা মেসে থাকা শিক্ষার্থী কিংবা ফোন বন্ধ রাখা শিক্ষার্থীদের খোঁজ করতে করতে জান যায় যায় অবস্থা অনেক প্রার্থীর।
নিজেদের নেতৃত্বের জাত চেনানোর জন্য বিভিন্ন আয়োজনে নিজেদের প্রকাশ করার প্রাণবন্ত চেষ্টা চলছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণ আর ভোট নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চলছে নানান কারিশমা। নিজেকে সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থী প্রমাণ করার জন্য রীতিমতো সৃজনশীলতার প্রদর্শনী চলছে—মীনা কার্টুন থেকে মেসি, বিশ্বকাপ থেকে গিটার, উত্তরপত্র থেকে চুলের ক্লিপ, বই থেকে ক্যালেন্ডার, বাস থেকে বোতল, বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে মিকিমাউস, নিরীহ প্রজাপতি থেকে শক্তিশালী বাঘ, একে-৪৭ রাইফেল থেকে টাকার স্মারক, গোপাল ভাঁড় থেকে টিএসসির কুকুর—বাদ যায়নি কোনো কিছু।
আটকে গেলে আট, দশে দশ, আকাশে-বাতাসে দিচ্ছে ডাক, পাশ করবেন ৩৩-এ, আমরা করবো জয়, রক্তের সাথে বেঈমানি নয় (শ্লোগানগুলো ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করা, কারও প্রচারণার উদ্দেশ্যে নয়)—এমন নানান শ্লোগানে ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণ করার প্রাণবন্ত চেষ্টা চলছে অবিরাম। মামার জন্য ছোট ভাগনি ভোট চাইছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়, বন্ধু-বান্ধব, বড় ভাই-ছোট ভাইয়ের পাশাপাশি প্রার্থীদের জন্য ভোটের মাঠে নেমেছেন অপ্রকাশিত প্রেমিক-প্রেমিকারাও।
নানান রকম কনটেন্ট তৈরির মাধ্যমে চলছে প্রচার। এরই মধ্যে একদল শিক্ষার্থী নিজেদের নিয়ে মজার মজার কনটেন্ট বানিয়ে মজা পাচ্ছেন। প্রার্থীদের মধ্যেও আছে ভিন্নতা—বাহুবলী থেকে শুরু করে শারীরিক প্রতিবন্ধী (প্রতিবন্ধী শব্দটা প্রতীকী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে), ধর্মভীরু থেকে ধর্মউদাসীন, পর্দানশীল থেকে আল্ট্রা-মডার্ন—সবাই হয়েছেন প্রার্থী।
প্যানেল থেকে শুরু করে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা স্বাধীনভাবে প্রচার কার্য চালিয়ে যাচ্ছেন। কাদা ছোড়াছুড়ির বদলে চলছে ডিজিটাল আক্রমণ, অম্ল-মধুর আলাপনে চলছে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার প্রস্তুতি, কথার ফুলঝুড়ির সাথে ফুটছে প্রতিশ্রুতির খৈ। সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে থাকার অঙ্গীকারের পাশাপাশি পুরোনো ক্যাম্পাস, ক্যাফেটেরিয়া, বাস সার্ভিস, বৃত্তি, নতুন ক্যাম্পাস—সব বিষয় নিয়ে চলছে আলোচনা।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনেকেই খ্যাতিমান মানুষের জীবনী না পড়লেও মনোযোগ দিয়ে পড়ছেন প্রার্থীদের জীবনের উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলো। সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার্থীরা আছেন কিছুটা বেকায়দায়—মনোযোগ দিতে পারছেন না একাডেমিক পড়া কিংবা নির্বাচনে।
জকসু নির্বাচনের এই ডামাডোলে সকল শিক্ষার্থীদের সাথে সকল শিক্ষার্থীদের যে পরিচয় হলো, কাছাকাছি থাকার প্রবণতা গড়ে উঠল, সবাই সবাইকে জানতে- বুঝতে পারল—এটাই আগামী দিনের পথচলায় সহায়ক হবে। সবাই এখন থেকে জবিয়ান ভাবতে শিখবে, বুঝবে এবং বাস্তবায়ন করবে।
তবে সবচেয়ে আশার বিষয় হলো—এখনো পর্যন্ত কোনো ধরনের সহিংসতা ঘটেনি। প্রশাসন, প্রার্থী, সাধারণ শিক্ষার্থী—সবাই মিলে নির্বাচনটাকে নিয়ে যাচ্ছেন নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে। আগামী দিনে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ হয়ে উঠুক আশার বাতিঘর।
লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার ও সাবেক শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।


আপনার মতামত লিখুন :