আমেরিকার প্রতিবেশী ও এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলের অন্যতম আয়োজক মেক্সিকোতে দুর্ধর্ষ এক মাদক চক্র ও অপরাধী গোষ্ঠির প্রধানসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ সদস্যকে হত্যার ঘটনায় দেশটি জেড়ে রীতিমতো নরক গুলজার চলছে। বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে সহিংতা, আগুন, সড়ক অবরোধ ও বিমানবন্দরে হামলার ঘটনা। এই পরিস্থিতিতে দেশটির জনগণকে শান্ত থাকার আহবান জানিয়েছেন মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শেইনবাউম। তিনি জানিয়েছেন, সেনাবাহিনী দ্রুতই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে।
রোববার মেক্সিকোর পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য জালিস্কোতে মেক্সিকান সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্সের এক অভিযানে দুর্ধর্ষ অপরাধী গোষ্ঠী ‘নিউ জেনারেশন জালিস্কো কার্টেল` (সিজেএনজি)-এর প্রধান নেমেসিও ওসেগুয়েরা সেরভান্তেস ওরফে ‘এল মেঞ্চো’সহ দলের সাত সদস্য নিহত হয়েছেন।

মেক্সিকোর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স সেন্টার এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরের সহযোগিতায় স্পেশাল ফোর্স এই অভিযানটি পরিচালনা করে। সিজেএনজি’র শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত জালিস্কোর তাপালপাতে ওসেগুয়েরাকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে বিমান বাহিনীর একাধিক উড়োজাহাজ এবং ন্যাশনাল গার্ড ইউনিট মোতায়েন করা হয়েছিল।
মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, অভিযান চলার সময় মেক্সিকান সামরিক বাহিনীর ওপর হামলা চালানো হয়। আত্মরক্ষার্থে সেনারা পাল্টা গুলি চালালে ঘটনাস্থলেই চার অপরাধী নিহত হয়। এছাড়া গুরুতর আহত আরও তিনজনকে আকাশপথে মেক্সিকো সিটিতে নেয়ার সময় তাদের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে রুবেন এন মেঞ্চো রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে; তবে তার পরিচয় নিশ্চিত করতে ফরেনসিক পরীক্ষার সহায়তা নেয়া হবে।”
অভিযানে কার্টেলের আরও দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বিমান ভূপাতিত করতে সক্ষম রকেট লঞ্চারসহ বিভিন্ন অস্ত্র ও সাঁজোয়া যান জব্দ করা হয়েছে। এই অভিযানে স্পেশাল ফোর্সের তিন সদস্য আহত হয়েছেন। মেক্সিকো জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বিপাক্ষিক সমন্বয় ও সহযোগিতার কাঠামোর আওতায় মার্কিন কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই অভিযান চালানো হয়। উল্লেখ্য, এল মেঞ্চোকে ধরার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ১৫ মিলিয়ন ডলার এবং মেক্সিকো সরকার ৩০০ মিলিয়ন মেক্সিকান পেসো পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।
সহিংস প্রতিক্রিয়া ও জনজীবন: এই হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই মেক্সিকোর বিভিন্ন রাজ্যে ব্যাপক সহিংসতা শুরু হয়েছে। তামাউলিপাস, মিচোয়াকান এবং নায়ারিতসহ যেসব এলাকায় সিজেএনজি’র প্রভাব রয়েছে, সেখানে রাস্তা অবরোধ, যানবাহনে আগুন এবং সশস্ত্র সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।
জালিস্কোর গভর্নর রাজ্যে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করেছেন এবং জননিরাপত্তার স্বার্থে গণপরিবহন ও সব ধরনের জনসমাবেশ স্থগিত করেছেন। এছাড়া সোমবার পুরো রাজ্যে সশরীরে পাঠদান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নিরাপত্তার খাতিরে পুয়ের্তো ভাল্লর্তা বিমানবন্দর থেকে বেশিরভাগ ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সতর্কতা: সহিংস পরিস্থিতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা তাদের নাগরিকদের জন্য সতর্কতা জারি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র তার নাগরিকদের জালিস্কোসহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। মার্কিন উপ-পররাষ্ট্র সচিব ক্রিস্টোফার ল্যান্ডউ এই অভিযানকে মেক্সিকো ও বিশ্বের জন্য একটি বড় সাফল্য হিসেবে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে এয়ার কানাডা পুয়ের্তো ভাল্লর্তায় তাদের ফ্লাইট কার্যক্রম স্থগিত করেছে।

গুজব ছড়ানোর বিষয়ে সতর্কতা: যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত মেক্সিকান দূতাবাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু গুজব নাকচ করে দিয়েছে। তারা জানায়, কার্টেল সদস্যরা সাধারণ মানুষের ওপর হামলা করার পরিকল্পনা করছে বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা ভিত্তিহীন। দূতাবাস একটি নির্দিষ্ট এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টকে এই অপপ্রচারের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে।


আপনার মতামত লিখুন :