মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে অঞ্চলজুড়ে মার্কিন সামরিক তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যুদ্ধজাহাজ, আধুনিক যুদ্ধবিমান ও সেনা মোতায়েনের পাশাপাশি একাধিক সামরিক মহড়া চালানো হচ্ছে, যা সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কা আরও জোরালো করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যেকোনো সময় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। তবে ওয়াশিংটনের চাপ কিংবা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া হুমকিতে বসে নেই তেহরানও। কূটনৈতিক উদ্যোগ চালু রাখার পাশাপাশি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের প্রস্তুতিও নিচ্ছে ইরান।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রকাশিত স্যাটেলাইট ছবিতে ইরানের একাধিক পারমাণবিক স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদারের চিত্র ধরা পড়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থাপনাগুলো আগের তুলনায় আরও সুরক্ষিত ও শক্ত কাঠামোর করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতেও বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে তেহরান। ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক ১২ দিনের সংঘাতে আকাশ প্রতিরক্ষা ও যুদ্ধবিমান ঘাটতির অভিজ্ঞতার পর ইরান রাশিয়া থেকে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংগ্রহ করেছে। পাশাপাশি নতুন ফাইটার জেট যুক্ত করা হচ্ছে বহরে। সম্ভাব্য আকস্মিক হামলা মোকাবিলায় বিমানঘাঁটিগুলোর সংস্কার ও আধুনিকায়নের কাজও চলছে।
ইরানের সেমনান প্রদেশের শাহরুদ শহরে অবস্থিত দেশের সবচেয়ে বড় ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র দ্রুত পুনর্গঠন করা হয়েছে। যুদ্ধকালীন সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামতের পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সেখানে উৎপাদন ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বর্তমানে এই কেন্দ্রে আগের তুলনায় কম সময়ে বেশি সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি সম্ভব হচ্ছে।
সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি কূটনৈতিক চ্যানেলও খোলা রেখেছে দুই দেশ। সম্প্রতি জেনেভায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আলোচনা হলেও কোনো চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানো যায়নি।
এদিকে যুদ্ধ প্রস্তুতি জোরদার করতে ইরান নতুন করে ‘ডিফেন্স কাউন্সিল’ সক্রিয় করেছে। সাবেক আইআরজিসি কমান্ডার আলী শামখানিকে এই কাউন্সিলের সচিব করা হয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা কাঠামো শক্তিশালী করা এবং সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধে দ্রুত প্রতিক্রিয়ার কৌশল নির্ধারণ করাই এই কাউন্সিলের মূল লক্ষ্য।
পারস্য উপসাগরেও বাড়ানো হয়েছে ইরানি নৌবাহিনীর তৎপরতা। রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ নৌ-মহড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ স্ট্রেইট অব হরমুজে নজরদারি ও সামরিক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়েও কঠোর অবস্থানে রয়েছে তেহরান। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির ভেতরে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলন কঠোর হাতে দমন করা হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, ইরান স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছে— কোনো যুদ্ধ শুরু হলে তার প্রভাব শুধু সামরিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং অর্থনীতি ও বৈশ্বিক কৌশলগত ভারসাম্যেও বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে এই উত্তেজনা বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত শুরু হলে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে এবং পুরো অঞ্চলজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :