বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদের অলিগলিতে লুকিয়ে আছে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী পুরোনো স্থাপত্য, ধর্মীয় উপাসনালয় আর ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো। এমনই এক অনন্য নিদর্শন হলো ছতরপুর শাহী ঈদগাহ মসজিদ। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর উপজেলা-এর বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন-এর ছতরপুর গ্রামে অবস্থিত প্রায় ২০০ বছর পুরোনো এই মসজিদটি স্থানীয়দের কাছে ‘তিন গম্বুজের মসজিদ’ বা ‘গোলাপি মসজিদ’ নামেই বেশি পরিচিত। নান্দনিক নকশা আর অনন্য স্থাপত্যশৈলীর কারণে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন এই মসজিদটি দেখতে ও নামাজ আদায় করতে।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে এই মসজিদ নির্মাণের জন্য আলাদাভাবে একটি ইটভাটা তৈরি করা হয়েছিল।
সেই ইটভাটায় বিশেষ আকৃতির বড় বড় ইট পুড়িয়ে নির্মাণ করা হয় পুরো মসজিদটি। মসজিদ স্থাপনের নির্দিষ্ট কোনো সাল জানা না গেলেও ১৮৭৫–৭৯ সালের ব্রিটিশ ম্যাপে এই মসজিদের অবস্থান চিহ্নিত পাওয়া যায়। সেই সূত্র ধরে ধারণা করা হয়,
এটি প্রায় দুই শতাব্দী আগের স্থাপত্য নিদর্শন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মসজিদটির তিনটি গম্বুজের মধ্যে মাঝখানেরটি আকারে বড় এবং দুপাশের দুটি তুলনামূলকভাবে ছোট। ভিতরে ও বাহিরে রয়েছে সূক্ষ্ম কারুকাজ। গোলাপি রঙের দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় তিন ফুট। মসজিদের পাশে রয়েছে অজুখানা ও ইমাম সাহেবের থাকার ব্যবস্থা। তিন পাশে বাউন্ডারি দেয়াল আর সামনে বিস্তীর্ণ ঈদগাহ মাঠ,সব মিলিয়ে এক মনোরম পরিবেশে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদ।
মসজিদ কমিটির অর্থ বিষয়ক সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী মাস্টার জানান, তাঁদের পূর্বপুরুষরা শুধু মসজিদ নির্মাণ করেই যাননি মসজিদের নামে রেখে গেছেন কবরস্থান, পুকুর ও কৃষিজমিসহ নানা সম্পত্তি। এসব সম্পত্তি থেকে যে আয় আসে, তা দিয়েই মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ ও ইমাম সাহেবের বেতন পরিশোধ করা হয়। বর্তমানে রমজান মাসে তারাবির সময় মুসল্লির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় মসজিদের কিছু সংস্কারকাজও করা হচ্ছে।
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী আমিনুল হক চৌধুরী জানান, ছতরপুরের ঐতিহ্যবাহী চৌধুরী বংশধারার যাঁরা যুগে যুগে এই মসজিদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন—
মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন ,মোহাম্মদ এহসান উল্লাহ ,মোহাম্মদ আম্বর আলী চৌধুরী,মোহাম্মদ আমজাদ আলী চৌধুরী,মোহাম্মদ হায়দার আলী চৌধুরী এবংমোহাম্মদ রোছমত আলী চৌধুরী।
এছাড়াও তাঁদের আগে আরও অনেক দানশীল ব্যক্তি ছিলেন, যাঁদের নাম আজ ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গেছে। তবে তাঁদের অবদান আজও অমলিন হয়ে আছে এই মসজিদের প্রতিটি ইট-পাথরে।প্রতিদিন এই মসজিদে প্রায় শতাধিক মুসল্লি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। শুক্রবার জুমা এবং মাহে রমজানে তারাবির সময় মসজিদ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। ভেতরের জায়গা সংকীর্ণ হওয়ায় অনেক সময় মুসল্লিদের ঈদগাহ মাঠে চট বিছিয়ে নামাজ আদায় করতে হয়। স্থানীয় মুসল্লিরা জানান, এটি মূলত একটি ঈদগাহ মসজিদ। তিনটি গ্রামের মানুষ এখানে ঈদের নামাজ পড়েন। ঈদের দিন কয়েক হাজার মানুষ একসঙ্গে সালাত আদায় করেন। তিন গম্বুজবিশিষ্ট এমন পুরোনো মসজিদ এখন আর সচরাচর দেখা যায় না বলেই অনেকেই কৌতূহল নিয়ে এখানে আসেন। স্থানীয়রা আরো বলেন মসজিদের ইমাম ও খতিব হাফেজ সিরাজুল ইসলাম ,দীর্ঘ ২১ বছর ধরে ইমামতি করে আসছে। এখানকার মুসল্লিরা খুব আন্তরিক। অর্থের অভাবে আমরা অনেক প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ করতে পারছি না। সরকারিভাবে অনুদান পেলে মসজিদটির সংরক্ষণ আরও ভালোভাবে করা যেত।
দুই শতাব্দীর বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ছতরপুর শাহী ঈদগাহ মসজিদ কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়,এটি এ অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থাপত্যরুচির জীবন্ত দলিল। যথাযথ সংরক্ষণ ও সরকারি সহযোগিতা পেলে এই অনন্য স্থাপত্য নিদর্শন আগামী প্রজন্মের কাছেও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে নীরবে, গর্বের সাথে


আপনার মতামত লিখুন :