ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২১ মাঘ ১৪৩২

“জনমানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণই স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণের মূল ভিত্তি”

তারিক আফজাল | জানুয়ারি ২০, ২০২৬, ০৯:৩৭ পিএম “জনমানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণই স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণের মূল ভিত্তি”

পরিবর্তনশীল বিশ্ববাজার, রপ্তানিখাতের নীতিমালা পরিবর্তন, পরিবর্তিত কর, আমদানি শুল্ক, বৈশ্বিক যুদ্ধাবস্থা, বিশ্ববাজার অর্থনীতির মন্দাভাব, দেশের ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট ও মন্দ ঋণের প্রভাব, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালার পরিবর্তন ও সামগ্রিক অবস্থার দরুন মূল্যস্ফীতি—দেশের জনমানুষের প্রতিনিয়ত শঙ্কার কারণ। সীমিত রোজগার, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সিন্ডিকেট বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ইত্যাদি এক অজানা আশঙ্কার জন্ম দেয়। এর পরিত্রাণ একমাত্র দেশের মৌলিক চাহিদা পূরণের উৎস ও তার সঠিক প্রয়োগ এক দূরবর্তী সমাধান এনে দেবে।

বিশ্ববাজার অর্থনীতিতে আমদানি ও রপ্তানি খাতও সম্পূরক ভূমিকা রাখতে পারবে, রিজার্ভ বাড়বে, দেশীয় জিডিপির প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করবে।

কৃষি প্রধান আমাদের এই দেশ। ১৯৭১ স্বাধীনতা-উত্তর, ১৯৭৭ স্বাধীনতার এক দেশপ্রেমিকের উত্তরণ—সেই থেকে আজ অবধি জনসংখ্যার উত্তরণে বাংলাদেশ কৃষি খাতে এক অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখে চলেছে। দেশের প্রায় সকল মানুষের আহার জোগাড় হচ্ছে। কিন্তু অন্ন উৎসের সেই কৃষকের জীবনমান উন্নয়ন, প্রযুক্তির অভাব, উচ্চ সুদে কঠিন শর্তে ঋণ, এনজিও থেকে অর্থ সংগ্রহ ও ঋণের কিস্তি আদায়ে অসহায় কৃষকের জীবনহানি—বিবিধ কারণে কৃষি আজও সমসাময়িক প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক মানে উন্নীত হতে পারেনি।

বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা অনুসরণ, সরকারের আন্তরিকতা থাকলেও সামগ্রিকভাবে এর প্রসার আজও বহুদূরের পথ।

বেসরকারি ব্যাংকের নিজস্ব তদারকিতে সরাসরি কৃষককে স্বল্প সুদে ও সহজ শর্তে ঋণ প্রদান আজও প্রতিফলিত হয়নি। এজেন্ট ব্যাংক, উপশাখা ও শাখা থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকগুলো আজও শহরভিত্তিক ব্যাংকিং করে মুনাফা করে যাচ্ছে, কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা সত্ত্বেও এনজিওর মাধ্যমেই চড়া সুদে কৃষি ঋণ বিতরণ করছে—শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া টার্গেট পূরণের লক্ষ্যে। বর্তমানে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কৃষককে কৃষি কার্ড দেওয়া হলে তার পূর্ণ প্রয়োগ, কার্ডের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ সরকারি ও বেসরকারিভাবে পূর্ণগতিতে, দীর্ঘ মেয়াদে ও সহজ শর্তে প্রদান আজও এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। সরকারি ব্যাংকের দুর্নীতি ও বেসরকারি ব্যাংকের অনীহা কৃষকের আজও এক অভিশাপ। আমার অভিজ্ঞতার এক বহিঃপ্রকাশ—আজও কৃষকের এলাকা ভিত্তিক জরিপ, জমি চাষি ও বর্গা চাষির প্রয়োজনমাফিক ঋণ প্রদান, প্রযুক্তির প্রয়োগ ও ব্যবহার বৃদ্ধি এবং কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া আজও এক প্রহসনের পর্যায়ে। অতঃকিন্তু, সঠিক উৎপাদনের মাত্রা নির্ধারণ, দেশীয় চাহিদা পূরণ ও রপ্তানিমুখী করণ আজও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি।

আমি বিশ্বাস করি, আগত দিনে কৃষকের জীবনমান উন্নয়ন, কৃষির অগ্রগতিতে কৃষি কার্ড এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর সঠিক বাস্তবায়ন, প্রয়োজনীয় জরিপের মাধ্যমেই ঋণ প্রদান, কিস্তি নির্ধারণ, দেশীয় চাহিদা পূরণ ও রপ্তানি এক অনন্য উচ্চতায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখবে। পাশাপাশি, বেকারত্ব হ্রাস, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন (কৃষির প্রসারে) প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। অর্থনীতির প্রসার দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে, সামগ্রিক জিডিপি বৃদ্ধি, জনমানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি ও দেশীয় মুদ্রার সঞ্চালন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাবে। স্বাধীনতার সুফল, ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের সার্থকতা প্রতিষ্ঠিত হবে।

বাংলাদেশ আজ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার মহাসড়কে অবস্থান করছে। যোগ্য নেতৃত্ব ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা আজ সময়ের দাবি। মোটা দাগে, জনজীবনের উন্নয়ন ও চাহিদা পূরণ, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কৃষক ও কৃষির সহজ ঋণ ও প্রযুক্তির প্রসার, আমদানি-রপ্তানি বান্ধব নীতি প্রণয়নসহ দুর্নীতি রোধ আজ অত্যন্ত প্রয়োজন।

কৃষি জমির বর্তমান জরিপ, প্রয়োজনীয় খাল খনন করে পানি সরবরাহ, প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

আন্তর্জাতিক মানের উপকরণ, বীজ ও সার সরবরাহ করতে পারলে বাংলাদেশ উন্নয়নে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে। আন্তর্জাতিক নির্ভরতা ও বৈশ্বিক চাপ কমবে এবং দেশীয় রাজনীতি আন্তর্জাতিক চাপমুক্ত হবে।

আগত দিনগুলো হোক মুখরিত আর হৃদয়ে “সবার আগে বাংলাদেশ”

 

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকার

Side banner
Link copied!