ঢাকা সোমবার, ০৪ মে, ২০২৬, ২১ বৈশাখ ১৪৩৩

গণমাধ্যম স্বাধীন ছিল কবে?

আমিনুল ইসলাম আহাদ | মে ৪, ২০২৬, ০১:০৯ পিএম গণমাধ্যম স্বাধীন ছিল কবে?

৩ মে, বিশ্ব গণমাধ্যম দিবস। দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশের বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন পৃথক পৃথক ব্যানার, প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন নিয়ে সড়কে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে।  সাংবাদিক নির্যাতন বন্ধ করো নিরাপদ কর্মপরিবেশ চাই  ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করো এমন নানা স্লোগানে মুখরিত হচ্ছে রাজপথ।

তবে প্রশ্ন থেকে যায়- এই স্লোগানগুলো কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে,  বাস্তবতায় কি বদল আনতে পারছে এসব প্রতিবাদ?

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তৃণমূল পর্যায়ের সাংবাদিকদের জীবনে এখনো ঝুঁকি, অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তাহীনতাই প্রধান বাস্তবতা। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলা, হুমকি, মামলা ও হয়রানির ঘটনা যেন নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশ করলেই শুরু হয় চাপ ও প্রতিহিংসা। প্রশ্ন জাগে—গণমাধ্যম স্বাধীন ছিল কবে?

গণমাধ্যম সাধারণ ছিল, এমন কোনো নির্দিষ্ট সময় আসলে ইতিহাসে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা কঠিন। কারণ গণমাধ্যম সব সময়ই কোনো না কোনো ক্ষমতার কাঠামো, অর্থনৈতিক চাপ বা রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে থেকেছে। তবে কিছু সময়কে তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাভাবিক বা কম চাপযুক্ত বলা যায়।

ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, উপমহাদেশে প্রিন্ট মিডিয়ার শুরুর দিকে, বিশেষ করে ব্রিটিশ আমলের শেষভাগে ও স্বাধীনতার পরের প্রথম দিকের সময়গুলোতে (১৯৪৭–৬০ দশক), সাংবাদিকতা কিছুটা আদর্শবাদী ও জনমুখী ছিল। তখন অনেক পত্রিকা সীমিত সম্পদ নিয়েও জনস্বার্থে কাজ করত। তবে সেই সময়েও সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও সেন্সরশিপ ছিল তাই একে পুরোপুরি  স্বাধীন বলা যাবে না।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, স্বাধীনতার পরের শুরুর বছরগুলোতে (১৯৭২–৭৫) কিছুটা মুক্ত পরিবেশ থাকলেও পরে রাজনৈতিক পরিবর্তন, একদলীয় শাসন এবং বিভিন্ন সময়ে সামরিক শাসনের কারণে গণমাধ্যম বারবার নিয়ন্ত্রণের মুখে পড়ে।

৯০-এর দশকের পর গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে এলে বেসরকারি টেলিভিশন ও নতুন পত্রিকার বিস্তার ঘটে, যা গণমাধ্যমকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। কিন্তু তখনও রাজনৈতিক প্রভাব, মালিকানার চাপ ও অর্থনৈতিক নির্ভরতা থেকেই যায়।বর্তমান সময়ে এসে প্রযুক্তি ও অনলাইন মিডিয়ার বিস্তার গণমাধ্যমকে অনেক বিস্তৃত করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে বাড়িয়েছে নতুন ধরনের চাপ—ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন,অনলাইন হয়রানি, ভুয়া তথ্যের প্রতিযোগিতা, এবং করপোরেট প্রভাব।

সংক্ষেপে বলা যায় গণমাধ্যম কখনোই পুরোপুরি সাধারণ বা চাপমুক্ত ছিল না বরং সময়ের সঙ্গে তার চ্যালেঞ্জের ধরন বদলেছে। আগে ছিল সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ও সেন্সরশিপ,এখন আছে আইনি, অর্থনৈতিক ও ডিজিটাল চাপের জটিল মিশ্রণ।

অনেক সাংবাদিক অভিযোগ করেন, মাঠে কাজ করতে গিয়ে তারা প্রায়ই একা পড়ে যান। কোনো ধরনের আইনি সহায়তা বা প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা না থাকায় ঝুঁকি নিয়েই দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী তথ্য থাকা সত্ত্বেও তা প্রকাশে অনীহা তৈরি হচ্ছে।

এদিকে আর্থিক দিক থেকেও সাংবাদিকদের অবস্থান নড়বড়ে। অনেক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত বেতন নেই, নেই ঝুঁকি ভাতা বা স্বাস্থ্য সুরক্ষা। মাসের পর মাস পারিশ্রমিক বকেয়া থাকা, স্বল্প আয়ে পরিবার চালানো এসব বাস্তবতা পেশাটিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দিবস উপলক্ষে স্লোগান ও মানববন্ধন সচেতনতা তৈরি করলেও বাস্তব পরিবর্তন আনতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত উদ্যোগ। শুধু প্রতীকী প্রতিবাদ নয়, সাংবাদিকদের সুরক্ষায় কার্যকর আইন প্রয়োগ,জবাবদিহিতা এবং শ্রম অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।

সাংবাদিক নেতাদের একাংশ বলছেন, প্রতিবছর একই দাবি নিয়ে রাস্তায় নামতে হয়। কিন্তু বাস্তবায়নের দিক থেকে অগ্রগতি খুবই সীমিত। ফলে হতাশা বাড়ছে।

অন্যদিকে সাধারণ সাংবাদিকদের ভাষ্য আমরা শুধু স্লোগান দিতে চাই না, আমরা নিরাপদভাবে কাজ করতে চাই। সত্য প্রকাশের জন্য যেন জীবন বা জীবিকা ঝুঁকিতে না পড়ে সেটাই আমাদের প্রধান দাবি।

বিশ্ব গণমাধ্যম দিবস-এর এই প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট হয়ে উঠছে স্বাধীনতার প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত। স্লোগান যত জোরালোই হোক,যদি তার প্রতিফলন মাঠে না আসে, তবে তা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা মানে শুধু সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষা নয় এটি একটি দেশের গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তি শক্তিশালী করার পূর্বশর্ত। তাই সময়ের দাবি—স্লোগান থেকে বাস্তবতায় রূপান্তর, প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপ।

লেখক : স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক কালের সমাজ

কালের সমাজ/এসআর

Link copied!