ঢাকা সোমবার, ১১ মে, ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩
লেয়ার ফার্মে ইমরানের অভাবনীয় সাফল্য

প্রতিদিন বিক্রি হচ্ছে ৮০ হাজার টাকার ডিম!

হাসনাত হান্নান তামিম, মহম্মদপুর (মাগুরা) | এপ্রিল ৩০, ২০২৬, ০৩:৪৩ পিএম প্রতিদিন বিক্রি হচ্ছে ৮০ হাজার টাকার ডিম!

বেকারত্ব মানেই জীবনের স্থবিরতা নয়, বরং নতুন কোনো শুরুর সম্ভাবনা; এই কথাটিই প্রমাণ করেছেন মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার দীঘা ইউনিয়নের ফলসিয়া গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা মো. ইমরান রেজা। চাকরির চিন্তা না করে মাত্র ২৮ বছর বয়সেই তিনি আজ একজন প্রতিষ্ঠিত খামারি। লেয়ার মুরগির (ডিম উৎপাদন) খামার করে নিজের ভাগ্য বদলানোর পাশাপাশি তিনি সৃষ্টি করেছেন অন্যদের কর্মসংস্থানও। তার এই অভাবনীয় সাফল্য উপজেলার অনেক তরুণদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইমরানের সফলতার পথটি মোটেও কুসুমাস্তৃর্ণ ছিল না। ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। ২০১২ সালে এসএসসি পাসের পর ঠিক কী কাজ শুরু করবেন তা নিয়ে কিছুটা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়েন। দিন যায়, সপ্তাহ্ মাস, চলে যায় মাস। পরিকল্পনা স্থির করতে তার কেটে যায় চারটি বছর। ২০১৬ সালে ইমরান বেছে নেন লেয়ার মুরগির ফার্ম গড়ে তোলার পথ। মাগুরা শহর থেকে মাত্র ৫০০টি লেয়াার মুরগির বাচ্চা কিনে বাড়ির আঙিনায় ছোট্ট একটি শেড দিয়ে শুরু করেন স্বপ্নের যাত্রা। সে সময় মুরগির বাচ্চা কেনা, খাঁচা তৈরি ও শেড নির্মাণসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ বাবদ তার খরচ হয়েছিল প্রায় চার লাখ টাকা। বাবা আব্দুস সাত্তার মোল্যা এবং মা’ মোছা. নূর জাহান সেই সময় পুরো টাকা দিয়ে ছেলের স্বপ্নযাত্রার সূচণা করান। কঠোর পরিশ্রম ও সঠিক পরিচর্যায় প্রথম ধাপেই সাফল্যের মুখ দেখেন ইমরান। এরপর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। তার এই সফলতা ও অগ্রযাত্রায় বাবা-ময়ের সার্পোটই ছিলো সবচে বড়।

দশ বছরের নিরলস প্রচেষ্টায় ইমরানের সেই ছোট্ট খামারটি আজ এক বিশাল শিল্পে পরিণত হয়েছে। পৈত্রিক ৮০ শতাংশ জমিতে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করেছেন পাঁচটি আলাদা বিশাল শেড (টিনশেড ঘর) ও প্রয়োজনীয় বিপুল সংখ্যক খাচা। বর্তমানে তার খামারে মুরগির সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। অসংখ্য খাঁচায় সাজানো এই খামারে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে আট হাজার ডিম উৎপাদিত হচ্ছে। মাগুরার স্থানীয় আড়তগুলোতে নিয়মিত সরবরাহ (বিক্রি) করা হচ্ছে এই ডিম।

বাজার দর অনুযায়ী বর্তমানে প্রতি হাজার ডিম নয় হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সেই হিসাবে প্রতিদিন ইমরানের খামার থেকে ৮০ হাজার ৭৫০ টাকার ডিম বিক্রি হচ্ছে।

ইমরানের এই ফার্ম থেকে প্রতিমাসে প্রায় ২৫ লাখ টাকার ডিম বিক্রি হচ্ছে। পাঁচ সদস্যের কর্মীবাহিনী এই খামারের দেখাশোনা করেন। পাঁচজন নিয়মিত শ্রমিক মুরগির পরিচর্যা, খাবার দেয়া, ওষুধ প্রয়োগ এবং ডিম সংগ্রহের কাজ করেন। শ্রমিকদের মজুরি, মুরগির খাদ্য ও ওষুধের যাবতীয় খরচ বাদ দিয়ে প্রতি মাসে ইমরানের নিট মুনাফা থাকছে সোয়া লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা। বর্তমানে তার খামারে থাকা মুরগির বাজারমূল্য প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাত্র চার লাখ টাকা দিয়ে শুরু করা সেই উদ্যোগ আজ অর্ধকোটি টাকারও বেশি সম্পদে রূপ নিয়েছে।

ইমরানের এই অভাবনীয় সাফল্য শুধু তার পরিবারের সচ্ছলতাই ফেরায়নি, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তার দেখাদেখি স্থানীয় আরও ১০-১২ জন তরুণ বাণিজ্যিকভাবে লেয়ার মুরগির ফার্ম গড়ে তুলেছেন। ফলসিয়া গ্রামটি এখন অনেকের কাছে ‘ডিমের গ্রাম’ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। এলাকার বেকার যুবকদের কাছে ইমরান এখন এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।

ইমরান রেজার এই অগ্রযাত্রা ও সফলতা প্রমাণ করে যে, অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রম থাকলে অল্প পুঁজি দিয়েও সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো সম্ভব। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ইমরানের মতো আরও অনেক তরুণ গ্রামীণ অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

নিজের এই অর্জন নিয়ে মো. ইমরান রেজা বলেন, “একটা সময় স্বপ্ন দেখতাম এমন কিছু করার যা আমাকে পরিচয়-পরিচিতি দেবে, আবার দশটা মানুষের উপকারেও আসবে। সেই স্বপ্ন আজ বাস্তব। আমি এখন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ও মানসিকভাবে তৃপ্ত। ধৈর্য আর সঠিক পরিকল্পনা থাকলে কৃষিনির্ভর দেশে এই খাতের মাধ্যমে যে কেউ সফল হতে পারে।”

কালের সমাজ/এসআর

গ্রাম-গঞ্জ বিভাগের আরো খবর

Link copied!