একসময়কার সুনামধন্য ও ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে বর্তমানে শিক্ষা ব্যবস্থার চরম অবনতি দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, শিক্ষক-শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক শিক্ষার পরিবেশ ভেঙে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে করে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা।
সরেজমিনে কলেজ ক্যাম্পাস ঘুরে এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কলেজে মোট ৬২ জন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও তাদের একটি অংশ নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকেন না। অভিযোগ রয়েছে, অনেক শিক্ষক কলেজ চলাকালীন সময় ক্যাম্পাসের বাইরে বিভিন্ন দোকানে আড্ডায় ব্যস্ত থাকেন। আবার কেউ কেউ হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে দ্রুত কলেজ ত্যাগ করেন। নারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিশেষ করে অনার্স শাখার অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। কলেজে বর্তমানে ১২টি অনার্স বিভাগ থাকলেও অধিকাংশ বিভাগে শিক্ষার্থী সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। কোথাও ১ জন, কোথাও ২ জন, আবার কোথাও ৪-৫ জন শিক্ষার্থী নিয়ে বিভাগ পরিচালিত হচ্ছে। ফলে অনেক বিভাগ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাজমুন নাহার গত চার বছর ধরে নিয়মিত ক্লাস ও বিভাগীয় কার্যক্রমে অনুপস্থিত। এ অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রধান অধ্যাপক এস এম জলিল। যদিও অভিযুক্ত শিক্ষিকা দাবি করেন, তিনি নিয়মিত কলেজে উপস্থিত থাকেন এবং হাজিরা প্রদান করেন। শিক্ষার্থী সংকটের কারণে ক্লাস পরিচালনা সম্ভব হয় না বলেও তিনি জানান।
কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে সুনামের সঙ্গে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হলেও সাবেক অধ্যক্ষ মোঃ খালেকুজ্জামানের অবসরের পর পরিস্থিতির অবনতি শুরু হয়। অল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দায়িত্ব নেওয়ায় প্রশাসনিক অস্থিরতা তৈরি হয়।
বর্তমানে পর্যন্ত ছয়জন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দায়িত্ব পালন করেছেন,যার ফলে শিক্ষক-শিক্ষকদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও গ্রুপিং বেড়েছে।
কলেজের বিদ্যোৎসাহী সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল হক বেপারী বলেন, “শিক্ষকদের দলাদলি ও রাজনীতির কারণে শিক্ষার মান তলানিতে নেমে গেছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহলকে একযোগে কাজ করতে হবে।
বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হান্নান দরিয়া জানান, তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর কিছু শৃঙ্খলামূলক পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানোর চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, “এত বড় একটি প্রতিষ্ঠান একা সামলানো সম্ভব নয়। সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়াতে প্রচারণা কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অভিযুক্ত শিক্ষিকার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণ পেলে গভর্নিং বডির সভায় উত্থাপন করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফ-উল আরেফিন বলেন, “কলেজে একজন নিয়মিত অধ্যক্ষ থাকলেও আইনি জটিলতার কারণে তিনি দায়িত্ব নিতে পারছেন না। আগামী মে মাসে মামলার স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হলে বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
এদিকে অভিভাবকরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা ব্যবস্থা আরও ভেঙে পড়বে। তারা একটি স্থায়ী অধ্যক্ষ নিয়োগ, শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ, নিয়মিত ক্লাস পরিচালনা এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, যথাযথ তদারকি, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুস্থ একাডেমিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে না পারলে ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটি তার গৌরব হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।
কালের সমাজ/এসআর

