ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩

৩৫ বছরেও অরক্ষিত উপকূলীয় এলাকার বেড়িবাঁধ

জেলা প্রতিনিধি, কক্সবাজার | এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ০৯:৩৬ পিএম ৩৫ বছরেও অরক্ষিত উপকূলীয় এলাকার বেড়িবাঁধ

আজ ভয়াল ২৯ এপ্রিল। ১৯৯১ সালের এই দিনে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল। দিনটি উপকূলবাসীর কাছে এখনও গভীর শোক ও বেদনার প্রতীক। স্বজন হারানোর সেই দুঃসহ স্মৃতি আজও তাড়া করে ফেরে উপকূলের মানুষকে।

জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষয় সব মিলিয়ে উপকূলীয় অঞ্চলের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। অনেক স্থানে এখনও অরক্ষিত রয়েছে বেড়িবাঁধ, যা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল দিনগত রাতে কক্সবাজারসহ উপকূলজুড়ে আঘাত হানে এক ভয়াবহ সুপার সাইক্লোন। ২০ থেকে ৩০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে যায় জনপদ। সরকারি হিসেবে প্রায় ২ লাখ মানুষ প্রাণ হারান এবং ১ কোটিরও বেশি মানুষ গৃহহীন হন। মারা যায় প্রায় ১০ লাখ গবাদিপশু। বেসরকারি হিসাবে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

কোস্টাল জার্নালিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশের সভাপতি মুহাম্মদ আতা উল্লাহ খান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলে ঝুঁকি বেড়েছে বহুগুণ। বন উজাড় ও প্যারাবন ধ্বংসের ফলে প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।

মহেশখালী উপজেলার ধলঘাটা ইউনিয়ন ছিল সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি। স্থানীয় ইউপি সদস্য নুরুল ইসলাম বাসি জানান, ওই রাতে আমিও ভেসে গিয়েছিলাম। এখনও আমাদের এলাকা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। প্রায় ৩৩ হাজার মানুষ এখানে বসবাস করছে। বর্ষার আগে বেড়িবাঁধ সংস্কার না হলে এই জনপদ টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
 

ধলঘাটার বাসিন্দা আফরোজা বেগম বলেন, সেই রাতে আমার পরিবারের ১৯ সদস্য মারা যায়। এখনও সেই স্মৃতি ভুলতে পারি না। ২৯ এপ্রিল এলেই বুক ভেঙে কান্না আসে। কুতুবদিয়ার খুদিয়ারটেক এলাকার বাসিন্দা রশিদ আহমদ জানান, তার পরিবারের ১৫ সদস্য সেই ওই রাতে প্রাণ হারায়। চোখের সামনে সবাইকে ভেসে যেতে দেখেছেন এই স্মৃতি কোনো দিন ভোলার নয়।
 

স্থানীয়দের অভিযোগ, কুতুবদিয়ায় এখনও ১২-১৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ছে লোকালয়ে, চরম দুর্ভোগে পড়ছেন বাসিন্দারা। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, কক্সবাজারে মোট ৫৯৬ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে প্রায় ২৫ কিলোমিটার এখনও খোলা এবং আরও প্রায় ৫০ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং সংস্কার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন।
 

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বেড়িবাঁধের নকশায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগের তুলনায় উচ্চতা ও প্রস্থ বাড়িয়ে নতুন ডিজাইন করা হচ্ছে।
 

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান বলেন, জেলা প্রশাসন আজকের দিনে সরকারিভাবে কোনো আয়োজন না করলেও বেসরকারিভাবে পুরো জেলায় নিহতদের স্মরণে নানা আয়োজন থাকবে বলে আমরা জানতে পেরেছি। বিশেষ করে মহেশখালী এবং কুতুবদিয়ায় আয়োজন থাকছে।
 

তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের উপকূলে দিন দিন ঝুঁকি বেড়েই চলছে। তাই এ ব্যাপারে পরিবেশবান্ধব, টেকসই, পরিকল্পিত উন্নয়ন প্রয়োজন বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা। পরিবেশবাদীরা বলছেন, শুধু অবকাঠামো নয়; উপকূলে ব্যাপক বনায়নও জরুরি। কারণ ১৯৯১ সালের দুর্যোগে অনেক মানুষ গাছ আঁকড়ে ধরে প্রাণে বেঁচেছিলেন।
 

আজকের দিনে উপকূলজুড়ে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে নিহতদের স্মরণ করা হচ্ছে। স্মরণসভা, মিলাদ মাহফিল, কোরআনখানি এবং প্রার্থনার আয়োজন রয়েছে ঘরে ঘরে। ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবেও অনুষ্ঠিত হবে সেমিনার। বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূল রক্ষা করা মানেই বাংলাদেশকে রক্ষা করা। তাই টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনার মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

 

কালের সমাজ/কে.পি

Link copied!