টানা দ্বিতীয় দিনে মুষলধারে বৃষ্টিতে পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে রাজধানীর ঢাকার বেশির ভাগ সড়ক-অলিগলি। বাদ যায়নি ঢাকার নামিদামি স্কুল কলেজের রাস্তাও। তবে কিছু এলাকায় সড়কে হাটু সমান পানি থাকলেও বেশিরভাগ ই কোমরপানিতে নিমজ্জিত। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন গোটা নগরবাসী।
মঙ্গলবার বেলা ১১টা ৪৮ মিনিটে রাজধানীর আকাশ হঠাৎই অন্ধকার হয়ে যায়। ১২টা বাজতেই শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি, যা ৪০-৪৫ মিনিটের মতো অব্যাহত থাকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর ডেমরার বাদশামিয়া রোড,সামসুল হক খান স্কুল এণ্ড কলেজ,ডগাইর ফার্মের মোড়, কোনাপাড়া-যাত্রাবাড়ি থানাধীন আর্দশবাগ, মাতুয়াইল মাঝপাড়া, মাতুয়াইল মাদ্রাসারোড,মৃর্ধাবাড়ি, কদমতলী-শ্যামপুর, পুরান ঢাকা, গোপীবাগ-বাসাবো, মানিকনগর, খিলগাও,রাজারবাগ-ফকিরের পুল, বায়তুল মোকাররম উত্তর গেইট, এলিফ্যান্ট রোড, নিউমার্কেট, মিরপুর, কালশী, ১০ নম্বর, কারওয়ান বাজার, জিগাতলা, গ্রিন রোড, মালিবাগ ও মোহাম্মদপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।
অনেক এলাকায় হাঁটুপানি,আবার কোমরপানি জমে যানবাহন চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন ঈদে ঘরমুখী ও বিভিন্ন কাজে বের হওয়া সাধারন মানুষকে। আর কোরবানির পশুর হাট ও তার আশপাশের এলাকায় তৈরি হয়েছে ভয়াবহ অবস্থা। দুর্গন্ধযুক্ত পানি আর ময়লা-আবর্জনায় ভরে গেছে কোরবারির হাট ও আশপাশের জায়গা।
ভারি বর্ষণে ডুবল ডেমরার নিম্নাঞ্চল: টানা দুইদিনের ভারি বর্ষণে ডুবে গেছে ডেমরা-যাত্রাবাড়ি এলাকার নিম্নাঞ্চল। দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা,ডুবে গেছে অলিগলির পথ। সামসুল হক খান স্কুল এণ্ড কলেজসহ অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিতরে-বাইরেও পানি জমে গেছে। একদিকে সড়কে পানি, অন্যদিকে স্কুলের মাঠে পানি। তবে ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে। ডেমরার নিম্নাঞ্চলের বাজার, রাস্তা-ঘাট, ঘরবাড়ি, রান্নাঘর এমনকি শৌচাগার পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ডেমরা থানাধীন কোনাপাড়া, সাইনবোর্ড, বক্সনগর, মহাকাশ রোড, বড়ভাঙ্গা, টেংরা ও সানারপাড়সহ অসংখ্য এলাকা ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। পয়ঃনিষ্কাশনের দূষিত পানি অনেক বাসার ভেতরে ঢুকে পড়ায় রান্নাঘর ও উঠান এখন ডুবে গেছে। শোবার ঘরের খাট থেকে পা নামালেও তা পানিতে ডুবে যাচ্ছে।
নিরাপদ পানির তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে নিম্নাঞ্চলগুলোতে। শৌচাগার ব্যবহারে বিঘ্ন ঘটছে। আর দৈনন্দিন সব কার্যক্রমই মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা এই নোংরা পানিতে জনজীবন কার্যত স্তব্ধ হয়ে গেছে। ডেমরার সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ডগাইর রুস্তম আলী হাই স্কুল ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, টেংরা ওরিয়েন্টাল হাই স্কুল, মাতুয়াইল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, জাকির হোসেন উচ্চ বিদ্যালয় ও সৃজনশীল স্কুলসহ বেশ কয়েকটি কিন্ডারগার্ডেন ও স্কুলের মাঠে বৃষ্টির পানি জমেছে।
ডিএসসিসির ৬৪, ৬৫ ও ৬৬নং ওয়ার্ডের ভুট্টু চত্বর, কোনাপাড়া, কদমতলা মোড়, ফার্মের মোড়, মোমেনবাগ চৌরাস্তা ও আশপাশের অভ্যন্তরীণ সব সড়কে বর্ষণের পানি জমে আছে। ডিএসসিসির ৬৭ ও ৬৮ নম্বর ওয়ার্ডের কোদাল দোয়া গ্রিন সিটি, ডগাইর মধ্যপাড়া, ডগার নতুন পাড়া, বামৈল, সানারপার, মধ্য ও পশ্চিম হাজিনগর এলাকার অভ্যন্তরীণ সড়ক নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। ভুট্টু চত্বর এলাকার সায়মা বেগম বলেন, সড়কে বর্ষার সময় পানি জমে চার থেকে পাঁচ মাস স্থায়ী হয়। আর পানি অপসারণের বিষয়ে কারো নজরদারি না থাকায় মানুষের ভোগান্তি বেড়ে যায়।
স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে সেফ এইড জেনারেল হসপিটালের চেয়ারম্যান সারোয়ার আরিফ উদ্দিন বলেন, জলাবদ্ধতায় দূষিত পানির সংস্পর্শে ছড়াচ্ছে নানা ধরনের জীবাণু। যা সহজেই খাবার, পানি ও ত্বকের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে। এর ফলে ত্বকের র্যাশ, ফাঙ্গাল ইনফেকশন, চোখে কনজাঙ্কটিভাইটিস, এমনকি লেপ্টোস্পাইরোসিস হতে পারে-যা কিডনি ও স্নায়ুতন্ত্রে মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়াও ভাইরাসজনিত সংক্রমণে ডায়রিয়া, বমি, জন্ডিস, গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিসসহ নানা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।
ডিএসসিসির ৬৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদপ্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার ওয়াদুদ বলেন, ডেমরা এলাকার ডিএসসিসির ৬৫-৬৮ নম্বর ওয়ার্ড ডিএনডির অভ্যন্তরে। আর ৬৬ নম্বর ওয়ার্ডে নিম্নাঞ্চল সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে নিচু সড়কগুলোতে দ্রুত বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে ড্রেনে আবর্জনা জমে বৃষ্টির পানি সরতে পারে না। এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট বিভাগকে ব্যবস্থা নিতে হবে।
কোমর পানিতে ভাসছে মাতুয়াইল শিশু হাসপাতাল: রাজধানীর মাতুয়াইলে শিশু মাতৃসদন হাসপাতাল (শিশু মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট) বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। সোমবার ও মঙ্গলবারের মুষলধারের বৃষ্টিতে হাসপাতালের সামনের সড়কসহ ভেতরে একফুটের বেশি পানি জমেছে। এতে হাসপাতালে আসা শিশু রোগী ও তাদের স্বজনদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
তবে রোগীদের স্বজন ও হাসপাতালের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি অভিযোগে বলেন, সাধারণত সামান্য বৃষ্টিতেই হাসপাতাল এলাকা তলিয়ে যায়। তিন চারদিনেও বৃষ্টির পানি নামে না। হাসপাতালের ভেতরে নালা নর্দমা ও আশপাশের সড়কের ড্রেন বন্ধ থাকায় পানি নামতে পারে না। কয়েকদিন এভাবে পানি জমে থেকে মারাত্মক দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে ও মশার উৎপাত বেড়ে যায়। দুর্গন্ধ ও মশার কারণে ছোট ছোট শিশুরা আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন। গত দুদিনের বৃষ্টিতে হাসপাতালের নিরাপত্তা কর্মীদের থাকার কক্ষ, জরুরী বিভাগে যাওয়ার রাস্তা, মূল গেটসহ পুরো এলাকা তলিয়ে গেছে। ভেতরে পানি জমে থাকায় কোন রোগীকে হাসপাতালের মূল গেট থেকে জরুরী বিভাগে চাইলে রিকশা ভাড়ার জন্য দিতে হচ্ছে ৩০ থেকে ৫০ টাকা।
নারায়নগঞ্জের বন্দর থেকে ৮ মাসের শিশুকে নিয়ে মঙ্গলবার দুপুরে হাসপাতালে আসেন আসমা বেগম নামে একজন মহিলা। তিনি বলেন, এখানে সবাই ছোট ছোট শিশু নিয়ে ভর্তি হয়েছে। দুদিনের বৃষ্টিতে পুরো হাসপাতাল এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, এ ঘটনায় হাসপাতাল কতৃপক্ষ বা সিটি করপোরেশন করো মাথা ব্যাথা নেই। তবে এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ডা. আব্দুল মান্নানকে কল করা হলে তিনি রিসিভ করেননি।
নিউমার্কেটের বাসিন্দা আহমদ হোসেন বলেন, জলাবদ্ধতা আর যানজটে নগরজীবন অতিষ্ঠ লাগছে। কোনো জায়গায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হলেও নিউমার্কেটে হবেই। কয়েক বছর ধরে এমন অবস্থায় আমরা নাজেহাল। তবুও এই জলাবদ্ধতা নিরসনে নেই কোনো উদ্যোগ। ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী রবিউল হাসান বলেন, টানা ভারী বৃষ্টিপাতে ডুবে গেছে পুরো এলাকা। একদিকে ঈদের ছুটি, অন্যদিকে বাড়ি যাওয়ার তাড়া। নোংরা পানি মাড়িয়ে লোকজনকে চলতে হচ্ছে। ঘুরমুখো মানুষের ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা ঢাকায় থাকি না কোথায় থাকি বুঝি না। এটি একটি রাজধানীর চিত্র হতে পারে না। বৃষ্টি হলে ভোগান্তি হবেই। পানি জমবেই। এমন ভোগান্তি আর মানা যায় না।
বৃষ্টিতে সদরঘাট-পাটুরিয়ায় লঞ্চ চলাচল সাময়িক বন্ধ: ভারী বৃষ্টির কারণে রাজধানীর সদরঘাট থেকে সব রুটে লঞ্চ চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রচন্ড কাল বৈশাখী ঝড়, বৃষ্টি ও বাতাসের কারণে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে বেলা ১১টা ২০ থেকে ফেরি চলাচলও বন্ধ রয়েছে। মঙ্গলবার নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে এই তথ্য জানানো হয়েছে। এদিন দুপুর ১২টা থেকে ঢাকায় মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। টানা ৪০ মিনিটের বৃষ্টিতে শহরের অধিকাংশ সড়কে কোথাও কোথাও হাটু সমান পানি জমে গেছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন পথচারীসহ নানা শ্রেণির মানুষ।
এদিকে বৃষ্টির কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েন ঈদের ছুটিতে বাড়ির উদ্দেশে বের হওয়া মানুষেরাও। বিশেষ করে ট্রেনের ছাদে করে যারা বাড়ি ফিরছেন, তাদের ভোগান্তির শেষ নেই। অন্যদিকে বৃষ্টির আগে সদরঘাট থেকে যেসব লঞ্চ বিভিন্ন গন্তব্যে রওনা হয়েছে, সেসবের যাত্রীরা রয়েছেন চরম আতঙ্কে। কারণ বৃষ্টি থামলেও বাতাস অব্যাহত আছে। ফলে এমন খারাপ আবহাওয়ায় অনেকটা ঝুঁকি আর আতঙ্ক নিয়েই নাড়ির টানে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে হাজারো কর্মজীবী মানুষকে।
কালের সমাজ/এসআর

