শুষ্ক মরুভূমির রুক্ষতা যেখানে ফুলের স্নিগ্ধতায় মিশে যায়, সেখানে সৃষ্টি হয় এক মোহনীয় শিল্প। ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলা সদরের তরুণ উদ্যোক্তা আকাশ সাহার বাড়ির ছাদে পা রাখলেই মনে হবে, বাংলার বুকে একখন্ড মরু উদ্যান। পেশাগত জীবনে তিনি স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট। কিন্তু দিনের শুরুর সময়টুকু এবং কর্মব্যস্ততার ক্লান্তি শেষে তার একমাত্র আশ্রয়স্থল হলো নিজের হাতে গড়া ‘নন্দন কানন’। আকাশ সাহা বোয়ালমারী সদরের ভজন কুমার সাহার ছেলে।
আকাশ সাহার এই গল্পের শুরুটা ২০১৯ সালে। বিশ্বজুড়ে তখন করোনাকালীন মহামারি আর লকডাউনের স্তব্ধতা। ঘরের চার দেয়ালে বন্দি অলস সময়ে অনলাইনের মাধ্যমে ২০টি অ্যাডেনিয়ামের চারা সংগ্রহ করেন তিনি। সেই সামান্য শুরু আজ ছয় বছরের ব্যবধানে বিশাল এক ‘গ্রিন শেডে’ রূপ নিয়েছে। প্রায় এক হাজার ৮০০ বর্গফুট জায়গাজুড়ে এখন চার হাজারের বেশি চারা। শখের বশে শুরু করা এই উদ্যোগ এখন পরিণত হয়েছে লাভজনক এক বাণিজ্যিক প্রজেক্টে।
আকাশ সাহার বাগানে রয়েছে ১০ থেকে ১২ প্রজাতির বিরল সব ক্যাকটাস। লেমন ক্যাকটাস, ফিসহুক, ফেইরি ক্যাসেল, বানি ভ্যারাইটি, ভেরিগেটেড জিম্মো ও এয়ার প্লান্টের মতো নামিদামি সব সংগ্রহ। কোনোটি দেখতে একদম জ্যামিতিক স্থাপত্যের মতো নিখুঁত, আবার কোনোটি নরম সাদা রোঁয়ায় ঢাকা। কেবল ক্যাকটাসই নয়, বাগানের প্রধান আকর্ষণ হলো ‘মরুর গোলাপ’ খ্যাত অ্যাডেনিয়াম। দক্ষিণ আফ্রিকার এই বিশেষ প্রজাতির ফুল এখন আকাশ সাহার ছাদে। লাল, সাদা, হলুদ, গোলাপি, কমলা, মেরুন ও বেগুনিসহ সাতটি ভিন্ন রঙে প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করছে। বড় আকারের কডেক্সযুক্ত অ্যাডেনিয়ামগুলো একেকটি জীবন্ত বনসাইয়ের মতো শোভা পাচ্ছে। এছাড়াও বাগানে আছে কাঠ গোলাপ, বাগান বিলাস ও কাঁটা মুকুটের নজরকাড়া সংগ্রহ।

শুরুতে এটি কেবল শখের বাগান থাকলেও এখন দর্শনার্থীদের আগ্রহ ও চাহিদার কারণে এটি বাণিজ্যিক রূপ পেয়েছে। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসছেন এই নন্দন কানন দেখতে এবং ঘর সাজানোর জন্য পছন্দের গাছ সংগ্রহ করতে। আকাশ সাহা বলেন, “প্রতিটি গাছ আমার কাছে পরিবারের সদস্যের মতো। ভোরে বাগানে সময় না দিলে আমার দিন শুরু হয় না। কোন গাছের কতটুকু পানি লাগবে, কার মাটি বদলাতে হবে, কোনটাতে ওষুধ দিতে হবে; সবই আমি নিজের হাতে তদারকি করি। সারাদিনের কাজের চাপ শেষে এখানে এলেই মন সতেজ হয়ে যায়।”
তিনি আরো বলেন, “শখ যখন কর্মসংস্থান ও আয়ের পথ তৈরি করে, তখন সেই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। আমি চাই আমার এই উদ্যোগ আরও বড় হোক এবং নতুনরা যেন পরিত্যক্ত জায়গাকে কাজে লাগিয়ে এমন সবুজ বিপ্লব ঘটাতে অনুপ্রাণিত হয়।”
আকাশ সাহার এই ‘গ্রিন শেড’ এখন কেবল একটি বাগান নয়, বরং এক সফল উদ্যোক্তার স্বপ্ন আর সাহসের প্রতীক। যেখানে মরুভূমির প্রতিকূলতার মাঝে ফুটে থাকা ফুল বাংলার প্রকৃতিতে এনে দিয়েছে এক নতুন ও স্নিগ্ধ আবহ।
স্থানীয় সাপ্তাহিক চন্দনা পত্রিকার সম্পাদক ও কবি কাজী হাসান ফিরোজ বলেন, ‘আকাশ সাহার এই মেধা ও পরিশ্রমের মেলবন্ধন পুরো বোয়ালমারী উপজেলার জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত। যেখানে মানুষ কেবল গতানুগতিক চাষাবাদে অভ্যস্ত, সেখানে বিরল প্রজাতির মরু উদ্ভিদের বাণিজ্যিক সফল চাষ তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। উদ্যোক্তা আকাশ সাহার এই নিরলস প্রচেষ্টায় ফোটা প্রতিটি ফুল আর কাঁটা যেন বলছে; পরিকল্পনা আর ভালোবাসা থাকলে ঘরের ছাদকেও এক আধুনিক শিল্পভুবনে রূপান্তর করা সম্ভব।’
কালের সমাজ/এসআর

