ঢাকা রবিবার, ১৭ মে, ২০২৬, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

মাগুরায় ৮৫ কোটি টাকার লিচু বিক্রির সম্ভাবনা

হাসনাত হান্নান তামিম, মহম্মদপুর (মাগুরা) | মে ১৭, ২০২৬, ০৩:৩০ পিএম মাগুরায় ৮৫ কোটি টাকার লিচু বিক্রির সম্ভাবনা

চলতি মৌসুমে লিচুকে ঘিরে মাগুরার গ্রামীণ অর্থনীতিতে ফিরে এসেছে ব্যাপক প্রাণচাঞ্চল্য। অনুকূল আবহাওয়া ও ভালো বাজার ব্যবস্থাপনার আশায় এবার জেলায় প্রায় ৮৫ কোটি টাকার লিচু বিক্রির প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় বাগান মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মৌসুমের শুরুতে তীব্র খরার প্রভাব থাকলেও শেষ সময়ে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার ফলন মোটামুটি সন্তোষজনক হয়েছে। জেলার বিভিন্ন বাগানে এখন থোকায় থোকায় ঝুলছে লাল-সিন্দুর রঙের টসটসে লিচু। গত বছরের তুলনায় এবার লিচুর আকার ও রঙ দুটোই ভালো হওয়ায় বাগান মালিকদের মুখে ফুটেছে স্বস্তির হাসি।

স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে প্রতিদিন ট্রাক ও পিকআপ ভর্তি লিচু ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে। লিচুর এই সম্ভাবনাময় অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে গত শনিবার (১৬ মে) মাগুরায় দুই দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী হাজরাপুরী লিচু মেলার উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি মন্ত্রী ও মাগুরা-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী।

মাগুরা সদর উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় মোট ৫৬৭ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে লিচুর আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫৩১ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে মাগুরা সদর উপজেলায়। এছাড়া মহম্মদপুরে ৬০ হেক্টর, শালিখায় ৪৩ হেক্টর এবং শ্রীপুর উপজেলায় ২৭ হেক্টর জমিতে লিচুর বাগান রয়েছে। শুধু সদর উপজেলাতেই গড়ে উঠেছে প্রায় তিন হাজার সাতশ’ বাণিজ্যিক লিচু বাগান।

মূলত সদর উপজেলার হাজরাপুর, হাজীপুর, রাঘবদাইড় ইউনিয়ন এবং পৌর এলাকার শিবরামপুর এখন লিচু উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বিশেষ করে হাজরাপুরী জাতের লিচু এখন জেলার ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে।

মাগুরার প্রায় পাঁচ হাজার কৃষক, ব্যক্তি ও বাগান মালিক সরাসরি লিচু উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। তবে এই মৌসুমি ফল শুধু চাষিদের অর্থনৈতিক স্বস্তিই দিচ্ছে না, বরং গ্রামীণ জনপদের হাজারো নিম্ন-আয়ের মানুষের জন্যও তৈরি করছে সাময়িক কর্মসংস্থান।

বাগান পরিচর্যা, পাহারা, লিচু সংগ্রহ, বাছাই, ঝুড়ি ও কার্টন প্রস্তুত এবং পরিবহনের কাজে বিপুল সংখ্যক নারী ও পুরুষ শ্রমিক কাজ করছেন। স্থানীয় রহিমা, আফরোজা, ফরিদা কিংবা আবজাল, আকুব্বর ও মোসলেমদের মতো অসংখ্য দিনমজুর এখন লিচু বাছাই ও প্যাকিংয়ের কাজ করে সংসারে বাড়তি আয় যোগ করছেন।

বর্তমানে বাজারে মানভেদে স্থানীয় জাতের প্রতি হাজার লিচু এক হাজার ৭০০ থেকে দুই হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে বোম্বাই ও চায়না-৩ জাতের উন্নতমানের লিচুর চাহিদা ও দাম আরও বেশি। প্রতি হাজার এই লিচু দুই হাজার ৬০০ থেকে দুই হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

হাজরাপুর গ্রামের ৬৭ বছর বয়সী লিচু চাষি মোজাফফর হোসেন বলেন, “আমার বাগানে স্থানীয় হাজরাপুরী ও বোম্বাই জাতের ৪০টি গাছ রয়েছে। লিচু চাষ এখন অনেক লাভজনক।”

দীর্ঘ প্রায় চার দশক ধরে লিচু আবাদ করা চাষি মো. উজির আলী বলেন, “আমি বোম্বাই জাতের লিচু সরাসরি ঢাকায় চালান দেই। এবার ফলন ও বাজার দুটোই ভালো।”

শুধু চাষিরাই নন, ব্যবসায়ী ও ব্যাপারীরাও এবার বেশ আশাবাদী। শাকেন শেখ (৫৫) নামের এক ব্যবসায়ী জানান, তিনি ২০ বছর ধরে লিচুর ব্যবসা করছেন। এবার সোয়া লাখ টাকায় একটি বাগানের ৪৬টি গাছ কিনেছেন এবং সেখানে ১৪ জন শ্রমিক নিয়োগ দিয়েছেন। কয়েক দিনের মধ্যেই লিচু বিক্রি শেষ করে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টাকা নিট লাভের আশা করছেন তিনি। বাগান মালিক তাহের হোসেন জানান, তিনি তার বাগানের ৪৫টি গাছ দেড় লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে মাগুরার হাজরাপুরী লিচুকে জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধন সনদ দেয়া হয়। এর পর থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকাররা এখান থেকে লিচু কিনে নিয়ে যান।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি উদ্যোগে কোল্ড স্টোরেজ ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে মাগুরার এই সম্ভাবনাময় লিচু শিল্প ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানির সুযোগ তৈরি করতে পারে।

মাগুরা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা বলেন, “এ বছর লিচুর আশানুরূপ ফলন ও চমৎকার কালার হয়েছে। জিআই স্বীকৃতির পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকাররা আগাম এসে বাগান বুকিং করছেন। সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে চাষিরা আরও লাভবান হবেন। চলতি মৌসুমে প্রায় ৮৫ কোটি টাকার লিচু বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে।”

Link copied!