বাংলাদেশের প্রকৃতি ও জলাভূমির এক চমৎকার সরীসৃপ প্রাণী ‘রামগোদাস’, যা সাধারণ মানুষের কাছে ‘গুইসাপ’, ‘সোনা গুইসাপ’ এবং ‘কালো গুইসাপ’ নামে পরিচিত। এটির ইংরেজি নাম : অংরধহ ডধঃবৎ গড়হরঃড়ৎ এবং বৈজ্ঞানিক নাম : ঠধৎধহঁং ংধষাধঃড়ৎ। কালো বা গাঢ়-কালচে বাদামি দেহের ওপর উজ্জ্বল হলুদ ফোটা ও চক্রাকার অলংকরণের কারণে এদের রূপ যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খলেও এদের ভূমিকা অপরিসীম। এটি আকারে অনেক বড় ও দীর্ঘ হয়।
গ্রাম-বাংলার নদ-নদী, খাল-বিল, পকুর, জলাশয়, মেহগনি বাগান বা বাঁশঝাড়ের স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে এদের বিচরণ। এরা একাধারে দক্ষ সাঁতারু এবং গাছে চড়তে পারদর্শী। মূলত জলজ ও স্থলজ উভয় বাস্তুতন্ত্রেই এরা নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারে। এরা চমৎকার সাঁতার কাটতে পারে। মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দক্ষিণ পাঁশের খালে ও খালের পাড়ে মাঝে মধ্যে কয়েকটি বড় গুইসাপের দেখা মেলে। ছবিতে প্রদর্শীত প্রাণীটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রজাতির গুইসাপ। স্থানীয় অনেকে এটিকে ঘড়িয়াল বলে ভুল করেন। এটি মূলত: গুইসাপ। রামগোদাস সম্পূর্ণ বিষহীন এবং স্বভাবগতভাবে ভীরু প্রাণী। এরা মানুষের কোনো ক্ষতি করে না, বরং পরিবেশের প্রত্যক্ষ উপকার করে। ক্ষতিকর ইঁদুর, বিষাক্ত সাপ, ব্যাঙ, কাঁকড়া, পচা, গলিত এবং মৃতপ্রাণী খেয়ে এরা প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে। এক অর্থে এরা প্রকৃতির ‘নীরব পরিচ্ছন্নতাকর্মী’ হিসেবে কাজ করে এবং পরিবেশকে রোগ-জীবাণুমুক্ত রাখে।
অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, জলাশয় ভরাট, ঝোপঝাড় ও বনজঙ্গল কেটে ফেলার ফলে এদের প্রাকৃতির আবাসস্থল দ্রুত সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। লোকালয়ে বা বাড়ির আঙিনায় দেখা গেলেই বিষাক্ত বা ক্ষতিকর ভেবে মানুষ অহেতুক আতঙ্কে এদের পিটিয়ে মেরে ফেলে। আন্তর্জাতিক এবং স্থানীয় বাজারে দামি চামড়ার লোভে এক সময় প্রচুর গুইসাপ শিকার করা হতো, যার নেতিবাচক প্রভাব এখনও রয়ে গেছে। বাংলাদেশে এরা ধীরে ধীরে বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় তলিয়ে যাচ্ছে। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী এই প্রাণীটি সংরক্ষিত। প্রকৃতির এই উপকারী বন্ধুকে টিকিয়ে রাখতে হলে সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে ভুল ধারণা ও ভীতি দূর করা অত্যন্ত জরুরি। বন বিভাগ ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর সচেতনতামূলক প্রচারণার পাশাপাশি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের কঠোর প্রয়োগই পারে গুইসাপকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে। মহম্মদপুর উপজেলা প্রাণী সম্পদ অফিসার ডা. সুব্রত সেন বিশ্বাস বলেন, “পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ক্ষতিকারক পোকা-মাকড় ও ইঁদুর নিয়ন্ত্রণে গুইসাপের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পচা, গলিত এবং মৃতপ্রাণী খেয়ে এরা প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে।”
কালের সমাজ/কে.পি

