ঢাকা শনিবার, ০১ আগস্ট, ২০২৬, ১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

তীব্র গরমে বছরে বাংলাদেশের ১৮০ কোটি ডলার ক্ষতি ঝুঁকিতে লাখো কর্মসংস্থান

আমিনুল হক ভূইয়া | জুলাই ৩১, ২০২৬, ১১:৪৭ এএম তীব্র গরমে বছরে বাংলাদেশের  ১৮০ কোটি ডলার ক্ষতি ঝুঁকিতে লাখো কর্মসংস্থান
সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অভিঘাতগুলোর একটি এখন দেখা যাচ্ছে চরম তাপপ্রবাহের কারণে। অতিরিক্ত গরমে শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া, উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টা হারানো এবং শিল্পখাতের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ফলে দেশের অর্থনীতি বছরে বিপুল ক্ষতির মুখে পড়ছে। 

সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তীব্র গরমের কারণে শুধু ২০২৪ সালেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সরাসরি ১৩০ থেকে ১৮০ কোটি (১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় শূন্য দশমিক ৩ থেকে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশের সমান।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে রয়েছে রাজধানী ঢাকা। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তীব্র গরমের কারণে ঢাকায় প্রতি বছর মোট উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টার প্রায় ৩ শতাংশ কার্যকরভাবে নষ্ট হচ্ছে। এর অর্থ প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ কর্মঘণ্টা হারিয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি শুধু শ্রমবাজারের জন্য নয়, বরং দেশের সামগ্রিক উৎপাদন ও বিনিয়োগ পরিবেশের জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা। তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করলে এই ক্ষতির পরিমাণ আরও দ্রুত বাড়তে থাকে।

বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ‘এ লিভেবল ফিউচার: প্রোটেক্টিং জবস অ্যান্ড গ্রোথ ফ্রম এক্সট্রিম হিট ইন সাউথ এশিয়া’স সিটিস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি যৌথভাবে তৈরি করেছে বিশ্বব্যাংক, যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (এফসিডিও), সিটি রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম এবং গ্লোবাল ফ্যাসিলিটি ফর ডিজাস্টার রিডাকশন অ্যান্ড রিকভারি (জিএফডিআরআর)। এতে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের শহরগুলোতে চরম তাপের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না হলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও গভীর হবে। ২০৮০ সালের মধ্যে ঢাকায় মোট উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টার প্রায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ চরম তাপপ্রবাহের কারণে হারিয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ, জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে কর্মসংস্থান, শিল্প উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যাবে।

বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, দিনের তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করলেই শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা দ্রুত কমতে শুরু করে। বিশেষ করে যেসব শ্রমিক খোলা আকাশের নিচে বা পর্যাপ্ত শীতলীকরণ ব্যবস্থা ছাড়া কারখানায় কাজ করেন, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত গরমে কাজ করার ফলে শারীরিক ক্লান্তি, পানিশূন্যতা, হিট স্ট্রেস এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে উৎপাদনে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পও এই সংকটের অন্যতম বড় ভুক্তভোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়েছে, তাপজনিত কারণে শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা কমে গেলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে এবং রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), আন্তর্জাতিক অর্থ করপোরেশন (আইএফসি) এবং কর্নেল ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের যৌথ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার পোশাক খাত ২০৩০ সালের মধ্যে সম্মিলিতভাবে প্রায় ৬ হাজার ৫৮০ কোটি মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে, যদি তাপজনিত উৎপাদনশীলতার সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়।

প্রতিবেদনে নারী শ্রমিকদের জন্যও বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। অতিরিক্ত গরমের কারণে নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলে অনেক ক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ, হয়রানি এবং সহিংসতার ঝুঁকি বেড়ে যায়। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের এই প্রভাব কেবল অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ও মানবিক সংকটও তৈরি করছে।

তবে সংকট মোকাবিলার সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার, কারখানার অভ্যন্তরীণ পরিবেশ উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও পানির দক্ষ ব্যবহার এবং টেকসই অর্থায়নের মাধ্যমে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব। দেশে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের উদ্যোগ ইতোমধ্যে ইতিবাচক ফল দিতে শুরু করেছে। বিশেষ করে গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড এবং পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে পোশাক শিল্পে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা সম্প্রসারিত হয়েছে। এর ফলে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশে পরিবেশবান্ধব ‘লিড’ সনদপ্রাপ্ত পোশাক কারখানার সংখ্যা ২৭০-এর বেশি হয়েছে, যা টেকসই শিল্প উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।

প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে চরম গরমের কারণে প্রতিবছর প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ কর্মঘণ্টা হারিয়ে যাচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি অন্তত ৭ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। একই সময়ে প্রায় ২৮ কোটি নতুন কর্মক্ষম মানুষ শ্রমবাজারে যুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও তীব্র তাপমাত্রা তাদের কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতার অন্যতম প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

আরও উদ্বেগজনক পূর্বাভাস হলো, ২০৭০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার অন্তত ৫২ কোটি মানুষ বছরে অন্তত এক মাস অত্যন্ত বিপজ্জনক তাপমাত্রার মুখোমুখি হবেন, যা বর্তমান পরিস্থিতির তুলনায় চার গুণ বেশি। পাশাপাশি, ২০০০ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতে তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে এবং শ্রীলঙ্কায় এই হার প্রায় চার গুণ বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপপ্রবাহ এখন আর কেবল একটি মৌসুমি দুর্যোগ নয়; এটি অর্থনীতি, শ্রমবাজার, জনস্বাস্থ্য এবং নগর ব্যবস্থাপনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। তাই তাপসহনশীল নগর পরিকল্পনা, সবুজ অবকাঠামো, শ্রমিকবান্ধব কর্মপরিবেশ, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং জলবায়ু অভিযোজনমূলক বিনিয়োগ বাড়ানো এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি। দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং শিল্পখাত ভবিষ্যতে আরও বড় ঝুঁকির মুখোমুখি হতে পারে।

কালের সমাজ/এএ ইচবি 

Link copied!